ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলায় এক বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযানে একটি গ্রামের অন্তত ৫৫০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে ধুবড়ি জেলার আলমগঞ্জের নয় নম্বর ব্লকে প্রায় ৬৫০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ঘরবাড়ি ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে প্রশাসন ৫০টিরও বেশি বুলডোজার নামায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মকতুব মিডিয়ার এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, রবিবার ভোর ৬টা থেকে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় ৫৫০টি পরিবারের প্রায় চার হাজার মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করে আসছিলেন। বুলডোজার দিয়ে একের পর এক ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের কান্না ও স্থানীয় একটি মসজিদে প্রার্থনা করতে দেখা যায়।
উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে বাসিন্দারা স্থানীয় ‘কামেল পীর সাহাবুদ্দিন আউলিয়া মাজার’-এ প্রার্থনা করেন এবং মাজারটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
ধুবড়ির জেলা কমিশনার দিবাকর নাথ সংবাদমাধ্যমকে জানান, নির্ধারিত জমিগুলোর মধ্যে প্রায় ৬৫০ বিঘা জমি উচ্ছেদ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, চিহ্নিত মোট এলাকার পরিমাণ প্রায় ৮০০ বিঘা, যেখানে প্রায় ৮০০টি পরিবার বসবাস করছিল। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ বিঘা জমিতে ১৬০ জনের মতো আবেদনকারীর বসবাস রয়েছে, যাদের মামলা হাইকোর্টে বিচারাধীন।
জেলা কমিশনার আরও জানান, প্রশাসন গৌহাটি হাইকোর্টে এ বিষয়ে একটি হলফনামা জমা দেবে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় উচ্ছেদ অভিযানটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ভেঙে ফেলা শুরুর আগেই প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় বা জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মালামাল নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। বাসিন্দাদের উচ্ছেদের আগে ১৫ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।
উচ্ছেদের বেশ কয়েক দিন আগেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যা অধিবাসীদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করে। তবে আইনি প্রতিকার চেয়ে আদালতে শরণাপন্ন হওয়া কিছু পরিবার এলাকাতেই থেকে যায়। এই আইনি রিট আবেদনের পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৩ নভেম্বর।
এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিডিয়াকে নিশ্চিত করেছেন যে রবিবারের অভিযানে এলাকার একটি স্কুল ভবন, একটি মাজার ও অন্যান্য উপাসনালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, আসাম জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাভাষী মুসলিমদের বসতি লক্ষ্য করে পরিচালিত ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে নগাঁও, হোজাই এবং গোলাঘাট জেলার বনভূমি এলাকা থেকে দুদিনের অভিযানে ১,১০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী সতর্ক করে বলেছে, আসাম রাজ্য সরকার কর্তৃক বাংলাভাষী মুসলিমদের এভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো বর্ণবাদ বা ‘অ্যাপারথেইড’-এর শামিল। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকার এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্রমাগত নাগরিকত্বের প্রমাণ চেয়ে খোলাখুলি বৈষম্যমূলক নীতি বাস্তবায়ন করছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।


