...|...|...

লাইফস্টাইল

বর্ষায় ফুড পয়জনিং থেকে বাঁচতে যা করবেন

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১০:৩৯ | আপডেট: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:৪৮
Shares
বর্ষায় ফুড পয়জনিং থেকে বাঁচতে যা করবেন

ছবি: এআই জেনারেটেড

বর্ষাকাল মানেই স্বস্তির বৃষ্টি, কিন্তু এর সাথেই বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে আসে খাদ্যবাহিত অসুখ। উচ্চ আর্দ্রতা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণুর বংশবৃদ্ধির জন্য প্রায় আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে, ফলে খাবার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে।

এর সাথে যোগ হয় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা, যা রেফ্রিজারেশনে বিঘ্ন ঘটিয়ে খাবারকে জীবাণুর প্রজননক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে। এই সময়ে হজম প্রক্রিয়াও কিছুটা ধীর হয়ে যায়, ফলে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা বদহজমের মতো উপসর্গও বেড়ে যায়।

বিশ্বব্যাপী তীব্র পেটের সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ ফুড পয়জনিং বা খাদ্যবাহিত অসুখ, যা সালমোনেলা, ই-কোলাই, নরোভাইরাস বা ক্যাম্পাইলোব্যাক্টরের মতো জীবাণু দ্বারা দূষিত খাবার বা পানি খাওয়ার ফলে হয়ে থাকে।

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)- এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ খাদ্যবাহিত অসুখে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে ১ লাখ ২৮ হাজার জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় এবং প্রায় ৩ হাজার জনের মৃত্যু ঘটে। 

উপসর্গ সাধারণত খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হতে পারে এবং সাধারণত ১-৩ দিন স্থায়ী হয়, তবে শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রে তা আরও গুরুতর হতে পারে।

যেসব খাবার এই সময়ে বাড়তি ঝুঁকিপূর্ণ

সারা বছরই খাদ্য নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সিডিসি নির্দিষ্ট কিছু খাবারকে অন্যগুলোর তুলনায় বেশি জীবাণুবাহী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্ষায় এসব খাবার আরও সতর্কতার সাথে গ্রহণ করা উচিত, প্রয়োজনে এড়িয়ে চলাই ভালো।

১. কাঁচা বা আধসেদ্ধ মাংস ও মুরগি

সিডিসি অনুসারে, মুরগি, টার্কি ও গরুর মাংস যদি ভালোভাবে রান্না না করা হয়, তাহলে তাতে সালমোনেলা ও ই-কোলাইয়ের মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে যেতে পারে।

কোলাই। ছবি: সংগৃহীত

২. কাঁচা ডিম

কাঁচা বা আধসেদ্ধ ডিম দিয়ে তৈরি খাবার- যেমন ঘরে তৈরি মেয়োনিজ বা কিছু মিষ্টিজাতীয় খাবার- খেলে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সিডিসি আরও জানায়, কাঁচা ময়দা বা কাঁচা খামির (raw dough বা raw batter) দিয়ে তৈরি খাবারও একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

৩. সামুদ্রিক খাবার ও শেলফিশ

কাঁচা মাছ, সুশি ও শেলফিশে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা টক্সিন থাকতে পারে, বিশেষত যেসব দূষিত পানি থেকে সংগ্রহ করা হয়।

৪. অপাস্তুরিত দুধ ও নরম পনির

সিডিসি সতর্ক করেছে, কাঁচা বা অপাস্তুরিত দুধ থেকে তৈরি নরম পনিরে লিস্টেরিয়ার মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা গর্ভবতী নারী ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্নদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

লিস্টেরিয়া। ছবি: সংগৃহীত

৫. তাজা ফল, সবজি ও অঙ্কুরিত শাক (স্প্রাউটস)

না ধোয়া ফল, পাতাযুক্ত শাক ও সবজিতে মাটির দূষক ও সেচের পানি থেকে আসা জীবাণু থাকতে পারে। সিডিসি বিশেষভাবে কাঁচা বা আধসেদ্ধ স্প্রাউটকেও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রেখেছে, কারণ স্প্রাউট জন্মানোর জন্য যে আর্দ্র পরিবেশ প্রয়োজন, তা জীবাণুর জন্যও আদর্শ প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। কাটা তরমুজও (cut melon) এই তালিকায় রয়েছে।

৬. রান্না করা ভাত ও পাস্তা

ভাত, নুডলস বা পাস্তা দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিলে তা দ্রুত ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থলে পরিণত হতে পারে।

৭. ডেলি মিট ও রেডি-টু-ইট সালাদ

আগে থেকে প্যাকেট করা সালাদ, কোলস্লো, পটেটো সালাদ ও স্লাইস করা ডেলি মিট সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং নাড়াচাড়ার সময়ও সহজে দূষিত হতে পারে।

ফুড পয়জনিং এড়াতে সিডিসি-র চার ধাপ

সিডিসি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চারটি মূল ধাপ অনুসরণের পরামর্শ দেয়- পরিষ্কার রাখা, আলাদা রাখা, ঠিকভাবে রান্না করা এবং দ্রুত ঠান্ডা করা।

১. হাত ও রান্নাঘরের পৃষ্ঠতল পরিষ্কার রাখুন

খাবার তৈরির আগে, তৈরির সময় ও পরে, এবং খাওয়ার আগেও অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। প্রতিটি খাবার তৈরির পর বাসনপত্র, কাটিং বোর্ড ও রান্নাঘরের কাউন্টার গরম সাবান-পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন।

যেকোনো ফল বা সবজি খাওয়া বা রান্নার আগে চলমান পানির নিচে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। তবে সিডিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক করেছে- কাঁচা মুরগি রান্নার আগে ধোয়ার প্রয়োজন নেই, বরং তা ধুলে জীবাণু বেসিন, কাউন্টার ও অন্যান্য খাবারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

২. কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন

ক্রস-কন্টামিনেশন বা আন্তঃসংক্রমণ এড়াতে কাঁচা মাংস, মুরগি, সামুদ্রিক খাবার ও ডিম সবসময় রান্না করা বা সরাসরি খাওয়ার উপযোগী (রেডি-টু-ইট) খাবার থেকে আলাদা রাখুন।

বাজার করার সময় এগুলো অন্য খাবার থেকে আলাদা ব্যাগে রাখুন, সংরক্ষণের সময় সিল করা পাত্রে রাখুন যাতে রস চুইয়ে অন্য খাবারে না পড়ে, আর প্রস্তুত করার সময় কাঁচা মাংস-মুরগি-সামুদ্রিক খাবারের জন্য একটি এবং সবজি-রুটির মতো কাঁচা খাওয়ার খাবারের জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করুন।

৩. সঠিক তাপমাত্রায় রান্না করুন

রঙ বা গঠন দেখে বোঝা যায় না খাবার নিরাপদভাবে রান্না হয়েছে কিনা (শুধু সামুদ্রিক খাবার ছাড়া)- এর একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হলো ফুড থার্মোমিটার ব্যবহার করা।

সিডিসি-র সুপারিশ অনুযায়ী নিরাপদ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হলো: গরু, ভেড়া বা ছাগলের গোটা মাংসের জন্য ১৪৫°ফা (রান্নার পর অন্তত ৩ মিনিট রেখে দিতে হবে), মাছের জন্য ১৪৫°ফা বা যতক্ষণ না মাংস অস্বচ্ছ হয়ে কাঁটা দিয়ে সহজে আলাদা হয়, কিমা করা মাংসের জন্য ১৬০°ফা, এবং মুরগি ও অন্যান্য সব ধরনের পোলট্রির (কিমাসহ) জন্য ১৬৫°ফা। বেঁচে যাওয়া রান্না করা খাবার পুনরায় গরম করার সময়ও তা ১৬৫°ফা পর্যন্ত পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

৪. খাবার দ্রুত ঠান্ডা করুন

৪০°ফা (৪°সে.) থেকে ১৪০°ফা (৬০°সে.) তাপমাত্রার মধ্যবর্তী পরিসরকে সিডিসি ‘ডেঞ্জার জোন’ বলে অভিহিত করে, কারণ এই তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া সবচেয়ে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। তাই পচনশীল খাবার কখনোই ২ ঘণ্টার বেশি (আর তাপমাত্রা ৯০°ফা বা তার বেশি হলে ১ ঘণ্টার বেশি) ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়।

রেফ্রিজারেটর ৪০°ফা (৪°সে.) বা তার নিচে এবং ফ্রিজার ০°ফা (-১৮°সে.) বা তার নিচে রাখা উচিত। গরম খাবার ছোট ছোট অগভীর পাত্রে ভাগ করে রাখলে তা দ্রুত ঠান্ডা হয়। এছাড়া হিমায়িত খাবার কখনোই কাউন্টারে না রেখে রেফ্রিজারেটরে, ঠান্ডা পানিতে বা মাইক্রোওয়েভে গলানো উচিত, কারণ ঘরের তাপমাত্রায় খাবারের বাইরের অংশ দ্রুত ব্যাকটেরিয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশে পৌঁছে যায়।

অতিরিক্ত সতর্কতা

কোনো খাবার প্রত্যাহার বা ‘রিকল’ করা হলে তা সাথে সাথে ফেলে দেওয়া উচিত এবং সেটি যেখানে রাখা হয়েছিল, সেই রেফ্রিজারেটর অংশও পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।

শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক মানুষ ও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে খাদ্যবাহিত অসুখের ঝুঁকি ও তীব্রতা তুলনামূলক বেশি বলে সিডিসি জানিয়েছে- তাই এই গোষ্ঠীর মানুষদের বিশেষভাবে কাঁচা বা আধসেদ্ধ প্রাণিজ খাবার, কাঁচা স্প্রাউট এবং অপাস্তুরিত দুধ-জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

উপসর্গ গুরুতর হলে- যেমন দীর্ঘস্থায়ী বমি, তীব্র ডায়রিয়া, উচ্চ জ্বর, পায়খানায় রক্ত বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে- দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC), cdc.gov/food-safety