...|...|...

বিশ্ব

বন্যা মোকাবিলায় বিদেশি সহায়তার সিদ্ধান্ত বদলাল নেপাল

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১০:৩৬ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৮:১০
Shares
বন্যা মোকাবিলায় বিদেশি সহায়তার সিদ্ধান্ত বদলাল নেপাল

ছবি: সংগৃহীত

নিখোঁজ নাগরিকদের স্বদেশের পক্ষ থেকে আসা তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে ভোতেকোশি আকস্মিক বন্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলের সহায়তা না নেওয়ার পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে নেপাল সরকার।

গত বুধবার সরকার জানিয়েছিল যে নেপালি উদ্ধারকর্মীরাই অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য সক্ষম এবং তারা অন্য কোনো দেশের উদ্ধারকারীদের অনুমতি দেবে না। কিন্তু নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধারে সীমিত পরিসরে সুড়ঙ্গ উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা এবং ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।

দ্য কাটমুন্ডু পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নিখোঁজদের তালিকায় নিজ দেশের নাগরিক থাকায় অন্তত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং কিছু বিশেষজ্ঞকে প্রবেশের অনুমতি দিতে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছি। আমরা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিত সংখ্যক বিশেষজ্ঞকে অনুমতি দিচ্ছি।

ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোকে লন্ডভন্ড করে দেওয়া এই প্রলয়ংকরী আকস্মিক বন্যায় শুক্রবার পর্যন্ত ৫৫০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ৩১টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশিসহ মোট ৯৭৭ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সর্বশেষ রেকর্ড অনুযায়ী, নিখোঁজদের তালিকায় ভারতীয় নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি (১৭৮ জন), এরপর রয়েছেন ৬৫ জন আমেরিকান, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৫ জন অস্ট্রেলিয়ান এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক।

ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের মূল্যায়নের ভিত্তিতে, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে সরকার ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে সুড়ঙ্গ উদ্ধার, ডিএনএ এবং ফরেনসিক পরীক্ষায় অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ান দল পাঠানোর সবুজ সংকেত দিয়েছে।

নেপালের জন্য ত্রাণ সহায়তা ঘোষণার পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি দেশ তাদের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সরকার সেগুলোর অনুরোধ আমলে নেয়নি। রাজধানী কাঠমান্ডুতে অবস্থিত অন্তত দুটি দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা—যাদের দেশের বহু নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন—জানান যে তারা উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য দল পাঠানোর অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি।

একটি দূতাবাসের কর্মকর্তা বলেন, আমাদের লোকজনকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই তিন দিন পার হয়ে গেছে। আমরা তাদের নিয়ে সত্যি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কিন্তু সহায়তার জন্য করা আমাদের অনুরোধগুলো আমলে নেওয়া হয়নি।

কিছু দেশ নেপালকে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য প্রকাশ্যে প্রস্তাবও দিয়ে আসছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার জানান যে, ভারত একটি সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল, একটি মেডিকেল দল এবং তাদের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

একই দিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়সওয়ালও এই বিপর্যয় নিয়ে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সাথে কথা বলেন। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জয়সওয়াল লেখেন, সকালে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আমার কথা হয়েছে। আমরা তাদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছি। তারা সেগুলো মূল্যায়ন করে দেখছেন।

তিনি উল্লেখ করেন যে, নেপালের জন্য ত্রাণের চতুর্থ চালান পাঠানোর সময়, সুড়ঙ্গ উদ্ধার অভিযানের জন্য চিকিৎসক, প্যারামেডিকস ও উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়ে গঠিত ১১ সদস্যের একটি দলও সেই ফ্লাইটে ছিল।

দক্ষিণ কোরিয়াও প্রকাশ্যে অতিরিক্ত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানালের সঙ্গে কথা বলেন এবং যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকা নয়জন কোরিয়ান নাগরিকসহ নেপালে অবস্থানরত দক্ষিণ কোরিয়ানদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দুর্যোগস্থলে পাঠানো প্রম্পট রেসপন্স টিম যেন নির্বিঘ্নে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে পারে, সে বিষয়ে নেপাল সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন চো।

এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে চো হিউন বলেন, আমাদের আজ পাঠানো প্রম্পট রেসপন্স টিম যেন নির্বিঘ্নে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে পারে, সেজন্য আমি নেপাল সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেছি।

তিনি আরও বলেন, কোরিয়া ডিজাস্টার রিলিফ টিমকে দ্রুত পাঠানোর জন্য আমরা সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি।

নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তারা কেবল প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতেই বিদেশি সহায়তা গ্রহণ করবে। খানাল দ্য কাটমুণ্ডু পোস্টকে বলেন, আমরা সহায়তার জন্য তিনটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছি এবং সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সহায়তা চাচ্ছি।

রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারের জন্য এই চারটি দেশের বিশেষজ্ঞ দলগুলোকে অনুমতি দেওয়া হবে। বুধবারের এই বন্যায় ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—রসুরের আটটি এবং নুওয়াকোটের ছয়টি—ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক অ্যাসোসিয়েশন, নেপাল-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণাধীন ২১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আন্দ্রিতিজ হাইড্রো-র ৭৬ জন কর্মী এখনও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া রাসুবগঢ়ী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৫১ জন এবং মাইুলং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাওয়ার হাউসের আটজন কর্মীও নিখোঁজ রয়েছেন।

একইভাবে, কর্তৃপক্ষ বুধবার লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে আটকা পড়া ৬০ জন—যাদের মধ্যে ২৫ জন স্টাফ ও ৩৫ জন শ্রমিক—তাদের সঙ্গেও এখনও যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিশূলী-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৪৫ জন টেকনিশিয়ান, স্টাফ এবং কনসালট্যান্টও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। এমনকি নেপালি সেনাবাহিনী ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের বেশ কয়েকজন শ্রমিককে উদ্ধার করলেও এখনও ৩৫ জন সুড়ঙ্গের ভেতরেই আটকে আছেন।

যেহেতু নেপালের ল্যাবগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার সীমিত সক্ষমতা রয়েছে, তাই মৃত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণে সহায়তা করার জন্য ওই দেশগুলোর পৃথক বিশেষজ্ঞ দলগুলো কাজ করবে।

খানাল বলেন, আমাদের প্রচুর নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। মৃতদেহগুলো দ্রুত শনাক্ত করতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আমাদের সহায়তা করবেন।