উজানের ঢলে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। পানি ঢুকে পড়ায় দুই ইউনিয়নের ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
তবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পানিবন্দি এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ফারাক্কা হয়ে আসা উজানের পানির ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমার উচ্চতা নির্ধারিত রয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। সে হিসাবে বর্তমানে বিপৎসীমার ৯২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
পানি বাড়ায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ সড়ক ও যোগাযোগপথ ডুবে গেছে। এতে দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মূল ভূখণ্ডের সাথে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে বন্যার পানি ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে ঢুকে পড়েছে। এতে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বসতবাড়ির আশপাশেও পানি চলে আসায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মানুষ। একই সাথে গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে দুর্গত এলাকাগুলোতে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজানের পানির ঢলে পদ্মার পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তিনি আরও বলেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট তীব্র হতে পারে। পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে সার্বিক পরিস্থিতি জানানো হচ্ছে।
দৌলতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, পানি বাড়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বন্ধের ঘোষণা না থাকলেও বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ভবনগুলো খোলা থাকবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বা গৃহহীন মানুষ যাতে প্রয়োজন হলে সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, প্রাথমিক হিসাবে নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছে উপজেলা প্রশাসন। পানিবন্দি মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমও চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, এরই মধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের ২৫০ থেকে ৩০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হবে।


