নেপালে আন্দোলনের ৩ মাস পরেই সংস্কার রূপরেখা সই
নেপালে জেন জি নেতৃত্বাধীন
গণআন্দোলনের তিন মাস পর সংস্কার রূপরেখায় সই করেছে অন্তর্বর্তী সরকার ও আন্দোলনের নেতারা। এই চুক্তির মাধ্যমে গত সেপ্টেম্বরের জেন জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে আনুষ্ঠানিকভাবে
‘গণআন্দোলন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ওই আন্দোলনের পর নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন–ইউএমএল
নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী সুশিলা কার্কি ১০ দফার চুক্তিতে সই করেন। জেন জি আন্দোলনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি ভোজ বিক্রম থাপা। তবে সই অনুষ্ঠানের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনের একাংশ বিক্ষোভ করে। তাদের অভিযোগ, চুক্তিতে জেন জি আন্দোলনের চেতনা ও জনআকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি।
‘জেন জি মুভমেন্ট নেপাল’-এর নেতা অজয় সোরাডি প্রকাশ্যে চুক্তির কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন। পরে
আরেক নেতা মিরাজ ঢুঙানাও চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও আন্দোলনের পরিচিত মুখ সুদান
গুরুং, পুরুষোত্তম যাদব, রক্ষা বাম, তাশি লাজোম ও ভাবনা রাউত স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত
ছিলেন।
চুক্তির মূল দিকগুলোতে রয়েছে—সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ দিতে কমিশন গঠন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, বিচার বিভাগ ও সরকারি প্রশাসনে সংস্কার, আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ, এবং দুর্নীতি দমন।
এতে জেন জি আন্দোলনকে নেপালের আগের ১৯৯০ ও ২০০৬ সালের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়
গণআন্দোলনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নেপালের ইতিহাসে প্রথমবার ‘ডিজিটাল নেতৃত্বাধীন
আন্দোলন’ এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক-প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরোধকে নাগরিক মতপ্রকাশের বৈধ
রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সরকার ও জেন জি পক্ষ যৌথভাবে
চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করেছে। সরকারের পক্ষে আলোচনায় ছিলেন সূর্য ঢুঙেল এবং আন্দোলনের
পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রাজু চাপাগাঁই। এছাড়া, ৮–৯ সেপ্টেম্বরের সহিংসতায় প্রাণহানি
ও সম্পদহানির জন্য দায়ী ব্যক্তি ও পরিস্থিতি তদন্তে গঠিত গৌরী বাহাদুর কার্কি নেতৃত্বাধীন
কমিশনের কার্যপরিধি আরও সম্প্রসারণেও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
চুক্তিতে আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির কথা বলা হয়েছে; তবে হত্যাকাণ্ড বা সংগঠিত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে ১৫ দিনের মধ্যে মুক্তির সুপারিশ করবে কমিশন।
শহীদ ও আহতদের
পরিবারকে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তায় উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন, ক্ষতিপূরণ, বিনামূল্যে
চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও অন্তর্ভুক্ত
রয়েছে। আন্দোলনকালে নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ নিয়ে পৃথক তদন্তের মাধ্যমে ৯০ দিনের
মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ ও বাস্তবায়নের সুপারিশের কথাও বলা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক
কোটা ও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বন্ধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপারদর্শিতা দূর করাও
চুক্তির লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি জমি ও অর্থ ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতা
ও দলগুলোর নামে গড়ে ওঠা ট্রাস্ট-ফাউন্ডেশন-তহবিল তদন্ত করে প্রয়োজন হলে বিলুপ্ত ও সম্পদ
রাষ্ট্রায়ত্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৫ মার্চ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ
নির্বাচন আয়োজন এবং ‘নোটা’সহ নির্বাচন সংস্কারের আইনি বিধান প্রবর্তনের কথা চুক্তিতে
তুলে ধরা হয়েছে।