নাজমুল হাসান রাজ
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচন পূর্ব অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সরকার। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডদের। নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে দিনরাত দায়িত্বপালন করা এসব ম্যাজিস্ট্রেটদের পেট্রোল-অয়েল- লুব্রিকেন্ট, দৈনিক খোরাকি এবং প্রাসঙ্গিক কাজে আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ ৩০ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা মঞ্জুর করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা এসব কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও ইসির ওই অর্থ দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে। আর এতেই কৌশলে বেশিরভাগ ডিসিরা জুনিয়র অফিসারদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেশের ৬৪ জেলায় আচরণবিধির দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য বরাদ্দ হওয়া এসব অর্থ হরিলুটের চিত্র জানতে অনুসন্ধানে নামে টাইমস টুডে। দেশের বেশিরভাগ জেলা প্রশাসকদের অনিয়মের চিত্র ফুটে ওঠে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে- একই ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও কোনো কোনো জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটরা পেয়েছেন মাত্র ১৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আবার কোথাও দেওয়া হয়েছে ১ থেকে ২ লাখ টাকা। এই বৈষম্যমূলক বণ্টন নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনে সিনিয়রদের ওপর জুনিয়র অফিসারদের ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনি প্রশ্ন উঠেছে জেলা প্রশাসকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই ধরনের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের কোথাও ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, আবার কোথাও ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা দেওয়া প্রমাণ করে বণ্টন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নেই। এটি ক্ষমতার সুস্পষ্ট অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক নৈতিকতার মারাত্মক লঙ্ঘন। এই অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
নির্বাচন কমিশনের নথি বলছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচন পূর্ব অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় নিয়োজিত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রাসঙ্গিক কাজে আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ জনপ্রতি ৯০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছে কমিশন। তাদের গাড়ির পেট্রোল, অয়েল এবং লুব্রিকেন্টের জন্য জনপ্রতি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তাদের খোরাকি বাবদ জনপ্রতি দেওয়া হয়েছে ২২ হাজার ৫০০ টাকা। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচন পূর্ব অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় নিয়োজিত একজন ম্যাজিস্ট্রেটের অনুকূলে নির্বাচন কমিশন বরাদ্দ দিয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা।
নথি বলছে, দেশের প্রতিটি জেলায় জনপ্রতি ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা হারে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যার বিপরীতে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেমন পঞ্চগড়ে পাঁচটি উপজেলার বিপরীতে ১০ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করায় মোট ১০ জনের অনুকূলে ২৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
নির্বাচনে আচরণবিধির জন্য নিয়োজিত থাকা ম্যাজিস্ট্রেটদের শুধু ডিউটির টাকাই বেহাত হয়নি বরং তারা স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে যে ৭ দিন ডিউটি করেছেন সেই টাকাও লোপাট হয়েছে।
নথিপত্র বলছে, ম্যাজিস্ট্রেটদের অনুকূলে ৭ দিন স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে ডিউটির জন্য আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ দেয় নির্বাচন কমিশন। ওই বরাদ্দে দৈনিক আপ্যায়ন ব্যয় বাবদ ২ হাজার টাকা হারে ৭ দিনে ১৪ হাজার টাকা জনপ্রতি দেওয়ার কথা। পেট্রোল অয়েল এবং লুব্রিকেন্টের জন্য জনপ্রতি প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা বরাদ্দ হলে মোট ৭ দিনে ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দৈনিক খাবারের জন্য ৫০০ টাকা হারে ৭ দিনে মোট ৩ হাজার ৫০০ টাকা জনপ্রতি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে এই ৭ দিনের ডিউটির জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা।
নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচন পূর্ব অনিয়ম রোধে কার্যক্রম ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের বিভিন্ন খরচের জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুকুলে ৩০ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে। এই অর্থ ৩টি ধাপে সংশ্লিষ্ট ৬৪ জন জেলা প্রশাসকদের অনুকুলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এই অর্থের পাশাপাশি নির্বাচনে যাতায়াত, ভোটকক্ষ নির্মাণ, অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র স্থাপন, ভোটকেন্দ্রে বেষ্টনীসহ নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নানাবিধ ব্যয় মেটাতে দেশের ৬৪ জেলা প্রশাসকের বিপরীতে ৫৪৬ কোটি ৯০ লাখ ২৯ হাজার ৭০০ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য নির্ধারিত অর্থ থেকে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই জেলা প্রশাসকদের। তবুও দুই থেকে তিনটি জেলা ছাড়া বাকি সকল জেলার প্রশাসক জুনিয়র অফিসারদের এই অর্থ তছরুপ করেছেন।
কোন জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটদের কত টাকা করে দিয়েছেন ডিসিরা?
টাইমস টুডের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগের মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলায় দায়িত্বরত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা ম্যাজিস্ট্রেটদের ১৫ হাজার, ৬০ হাজার, ৭২ হাজার এবং ৭৫ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। গাজীপুরে ৪০ হাজার, ১ লাখ এবং ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইলে ৮০ হাজার এবং ১ লাখ ২২ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। নরসিংদীতে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় সবাইকেই দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা করে। মানিকগঞ্জে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা করে। মুন্সিগঞ্জে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। রাজবাড়ীতে ৬০ হাজার, ৮০ হাজার এবং ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। শরীয়তপুরে ১০ হাজার, ৫০ হাজার এবং ৬৫ হাজার টাকা করে দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজার জেলায় দেওয়া হয়েছে ৮০ থেকে ১ লাখ টাকা করে। সুনামগঞ্জে অফিসারভেদে ৪০ হাজার, ৬০ হাজার, ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ২ লাখ ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা ও ২০০ লিটার জ্বালানি।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায় দেওয়া হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা করে। নেত্রকোনা জেলায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার করে দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শেরপুর জেলায় দেওয়া হয়েছে জনপ্রতি ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এদিকে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলায় দেওয়া হয়েছে জনপ্রতি ১ লাখ টাকা। গাইবান্ধায় ৮০ হাজার টাকা করে এবং ঠাকুরগাঁও জেলায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। দিনাজপুরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। নীলফামারীতে মাত্র ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, পঞ্চগড়ে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। রংপুরে ৫০ হাজার, ৭০ হাজার এবং ১ লাখ ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লালমনিরহাটে ৬০ হাজার টাকা এবং ২৫০ লিটার জ্বালানি দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। নাটোর এবং পাবনায় যথাক্রমে ৭৫ হাজার, ৭৬ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। বগুড়ায় ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার, রাজশাহীতে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
খুলনা বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় ১ লাখ ৭০ হাজার করে, খুলনা সদরে ৬৫ হাজার, ৮০ হাজার এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গাতে ৪০ হাজার, ৬০ হাজার, ১ লাখ, ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ৭০ লিটার করে জ্বালানি দেওয়া হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলায় ১ লাখ ৩৫ হাজার, নড়াইলে ৫০ হাজার, বাগেরহাটে ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। মেহেরপুরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। যশোরে ৬৪ হাজার এবং ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। তবে কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা।
বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, পটুয়াখালীতে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার এবং কয়েকজন কর্মকর্তাকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুর জেলায় দেওয়া হয়েছে ১ লাখ করে। এ ছাড়া ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে বরগুনা জেলাতে।
জানা গেছে, কক্সবাজারে ১ লাখ ১০ হাজার, কুমিল্লায় ২০ হাজার থেকে ৭০ হাজার, খাগড়াছড়িতে দেওয়া হয়েছে ৭৬ হাজার ৫০০ টাকা। চাঁদপুরে ১৫ হাজার, ৬০ হাজার এবং ৭৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ফেনী ও নোয়াখালীতে যথাক্রমে ৫০ এবং ৫৫ হাজার করে দেওয়া হয়েছে। বান্দরবানে ১ লাখ ২০ হাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১২ হাজার থেকে ৭০ হাজার, রাঙ্গামাটিতে ৮০ থেকে ৮১ হাজার এবং সবশেষ লক্ষ্মীপুর জেলায় দেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার টাকা করে।
বৈষম্যে শীর্ষে নীলফামারী-বরগুনা ও ফেনী
হাতে আসা নথিপত্র থেকে জানা গেছে, এই জেলাগুলোর ৬টি থানায় দায়িত্বপালন করা ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৮০ হাজার। যদিও তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৫ লাখ ১০ টাকা। ফলে এসব জেলাগুলোতে বেহাত হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
নির্বাচনকালীন এই বরাদ্দ নিয়ে টাইমস টুডের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের একাধিক জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তাদের দাবি- বরাদ্দ না থাকলেও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য বরাদ্দ হওয়া অর্থ জেলা প্রশাসকরা নিয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা থেকে ট্যাগ করে দেওয়া নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা উপসচিবদের অর্থ নিয়েও হয়েছে নানা নয়ছয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনার এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, সারাদেশেই এডিসি জেনারেলরা বরাদ্দ না পেলেও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। কারণ তারাই সরাসরি এই বণ্টন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমি মনে করি তাদের (এডিসি) জন্য বরাদ্দ থাকা উচিত। কারণ তারাও নির্বাচনের অনেক কাজ করেন। নির্বাচনের এই মহা আয়োজনে জড়িত থাকেন। তাদের বঞ্চিত করা উচিত নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মুখ খোলা যাবে না। মুখ খুললে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে এমন মন্তব্য করা হবে, যাতে পদোন্নতি আটকে যায়। এটা স্পষ্ট একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। আমরা চাইলেই ন্যায্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি না বলেও জানান তিনি।
এদিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা টাকা পান নিজেদের আইবাসে। একইভাবে আচরণবিধির মাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জুডিশিয়াল সার্ভিসের ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের অর্থ আইবাসে পান। অথচ বিসিএস প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই অর্থ দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকের নিকট। যদিও পূর্বে জুডিশিয়াল সার্ভিসের ম্যাজিস্ট্রেটরাও তাদের জেলা জজের কাছ থেকে এসব অর্থ পেতেন। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে এই নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। ফলে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা জানান, আমাদের সার্ভিসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অনিয়মের সুযোগ শেষ হবে, যদি জুডিশিয়াল সার্ভিসের মতো আমাদের নিজেদের আইবাসে এই অর্থ প্রদান করা হয়।
সরলরেখায় চলেছে ঢাকা-সুনামগঞ্জ
হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, দেশের বেশিরভাগ জেলাতে নজিরবিহীন অনিয়ম হলেও ঢাকা, সুনামগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে ন্যায্য বণ্টন করা হয়েছে। জনপ্রতি একই বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা জেলাতে জনপ্রতি ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জে দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার করে। এসব জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা স্বস্তির কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অন্তত সন্মানজনক একটা বণ্টন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মাঠ প্রশাসনের অভিভাবক ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, সরকারি তহবিল তছরুপ করার কোনো সুযোগ নেই। কোনো জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ থাকলে আমরা তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেব। এই অর্থ এদিক-ওদিক করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিষয়টি অবশ্যই তদন্ত করব। এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসলে আমরা নিশ্চয়ই সেটা দেখবো। যেটা যার প্রাপ্য সেটা তাকে দেওয়া না হলে সেটা আমাদের দেখতে হবে; ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ও সাবেক ড. আব্দুস সবুর বলেন, নির্বাচনকালীন আচরণবিধি বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনে যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দিনরাত কাজ করেন, তাদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ যদি জেলা প্রশাসকদের স্তরে গিয়ে অস্বচ্ছভাবে বণ্টন হয়- তাহলে সেটি কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি জবাবদিহিতার সংকটের প্রতিফলন।
সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবু আলম শহীদ খান বলেন, যদি এই টাকা আত্মসাৎ হয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। এই অর্থ যে খাতে এবং যেভাবে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা সেভাবে হয়েছে কিনা- এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মাসুদ আহমেদ সাইদ বলেন, নির্বাচন কমিশন যে অর্থ মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে, সেটি যদি জেলা প্রশাসকদের হাতে গিয়ে আটকে যায় বা ইচ্ছামতো কমবেশি করে বণ্টন করা হয়- তাহলে এটি নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি সরকারি অর্থ আত্মসাতের শামিল। কোনো জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত বিবেচনায় এ ধরনের অর্থ কাটছাঁট করার আইনগত ক্ষমতা নেই।

