...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

স্বাক্ষর করলেও চিঠির বিষয়বস্তু জানেন না বিটিআরসির পরিচালক রানা

চূড়ান্ত সনদ প্রদানের দুই বছর পর টেলিকম মনিটরিং সিস্টেমের কার্যকরিতা পরীক্ষায় মতামত গ্রহণ

এনায়েত শাওন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:১২
Shares
স্বাক্ষর করলেও চিঠির বিষয়বস্তু জানেন না বিটিআরসির পরিচালক রানা

টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) সম্পর্কে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সকল বিভাগের চাহিদা, প্রয়োজনীয় উন্নয়ন/সংযোজন, মতামত বা পরামর্শ চেয়ে ইউও নোট (আন-অফিশিয়াল নোট) জারি করা হলেও, চিঠিতে কী লেখা হয়েছে সে বিষয়ে কিছুই জানেন না সংস্থাটির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস (ইএন্ডও) বিভাগের পরিচালক মো. সোহেল রানা।

এ বিষয়ে সোহেল রানা বলেন, ‘আমি আসলে বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানি না। দেশের বাইরে ছিলাম, গতকালই অফিসে যোগদান করেছি। চিঠির বিষয়বস্তু আমার জানা নেই। আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেছে, তাই স্বাক্ষর করে দিয়েছি। ভেতরে কী আছে, তা আমি জানি না।’

জানা গেছে, গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ইএন্ডও বিভাগের পরিচালক সোহেল রানার বরাতে একটি ইউও নোট বিটিআরসির সব বিভাগে পাঠানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) সরবরাহ ও স্থাপনের লক্ষ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টিকেসি, কানাডার সঙ্গে ২০২১ সালের ২ আগস্ট একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর সিস্টেমটির চূড়ান্ত সনদ (Final Acceptance) দেওয়া হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বরে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির অপারেশনাল সাপোর্ট দেওয়ার মেয়াদ শেষ হবে।

নোটে আরও বলা হয়, এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের কার্যক্রমের আলোকে টিএমএস-সংক্রান্ত কোনো চাহিদা, প্রয়োজনীয় উন্নয়ন/সংযোজন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে তা ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ইএন্ডও বিভাগে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, টিএমএসের ফাইনাল এক্সেপ্টেন্সি রিপোর্ট বা চূড়ান্ত সনদ দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে দুই বছর আগে। এখন নতুন করে উন্নয়ন বা সংযোজনের প্রশ্ন আসছে কেন? তাহলে এটাই প্রমাণিত হয় যে টিএমএস ঠিকভাবে কাজ করছে না। অথচ দেশীয় মুঠোফোন কোম্পানিগুলোর সকল প্রকার রাজস্ব ফাঁকি রোধ ও সেবার মান বৃদ্ধিতে টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) হবার কথা ছিল গ্রাহকবান্ধব। কিন্তু কতিপয় কর্মকর্তার গাফিলতি ও অনিয়মের জেরে টিএমএস এখন বিটিআরসির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিএমএস সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য কানাডিয়ান টিকেসি টেলিকমের সঙ্গে বিটিআরসির চুক্তি মোতাবেক শতভাগ রিয়েলটাইম ডাটা দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। এ প্রেক্ষিতে অপারেশনাল সাপোর্টের নামে আবারও দুই বছরের জন্য চুক্তির ফন্দি আঁটছে কমিশন। এজন্য বিটিআরসির সকল বিভাগের কাছে মতামত চেয়েছে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অপারেশনস (ইএন্ডও) বিভাগ।

জানা গেছে, সেবার মান বৃদ্ধি, মুঠোফোন অপারেটরদের রাজস্ব ফাঁকি রোধ, কল ড্রপ মনিটরিং, ইন্টারনেটের গতি এবং ভয়েস কলের মান যাচাই ট্যারিফ, সার্ভিস, প্যাকেজ সমূহ সকল শর্ত প্রতিপালন করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের জন্য সংক্রিয় সেন্ট্রালাইজড সিস্টেমটি চালুর লক্ষ্য থাকলেও মূল কার্যপরিধি অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অজ্ঞতা ও বিটিআরসির অসাধু কর্মকর্তার অনিয়মের কারণে এই উদ্যোগটি এখন অচল। বিটিআরসির একটি মহল কারসাজির মাধ্যমে এই শতকোটি টাকা ব্যয়ের ‘বাতিল’ জিনিসকে সচল দেখিয়ে টাকা ছাড় করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এখানেই শেষ নয়, নতুন করে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ এক মিলিয়ন ডলার ছাড় করতে জালিয়াতির আশ্রয় নেয় সংস্থাটি।

জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ১৮০ দিনের কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও শেষ করতে পারেনি। মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে সয়ংক্রিয়ভাবে ডাটা প্রসেস করে তা বিশ্লেষণ করে সকল তথ্য শতভাগ সরবরাহ করার কথা থাকলেও ত্রুটি থাকায় টিএমএস বিটিআরসির কোনো কাজে আসেনি। এ কারণে দীর্ঘদিন উক্ত প্রকিউরমেন্টের চূড়ান্ত এক্সটেপন্স সম্পন্ন হয়নি এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনাদি আটকে দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই প্রকল্পে গোঁজামিল দিয়ে বিটিআরসির কর্মকর্তাদের যোগসাজসে অর্থ ছাড় করে নেয় কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ফাইনাল এক্সেপ্টেন্সি সনদ আদায় করে নেয় ৪ নভেম্বর ২০২৪ সালে। 

সূত্র মতে, চুক্তিপত্রে উল্লিখিত ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার ডলার অর্থ ছাড়ই শেষ কথা নয়, চুক্তি অনুযায়ী পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রতিবছর ১০ লাখ বা এক মিলিয়ন ডলার বিটিআরসিকে গুনতে হবে। এরই প্রথম কিস্তির টাকা পেতে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম বছরের কিস্তির টাকা পেতে চিঠি দেয় বিটিআরসির চেয়ারম্যান বরাবর। সেখানে ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর সময়ের জন্য পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৬ লাখ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪ লাখ ডলার দাবি করে। ফলে টিএমএস সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিনা তা যাচাই সাপেক্ষে চুক্তিমতে প্রথম বছরের এই অর্থ পরিশোধের জন্য গত ১০ জুন একটি কমিটি করে দেয় বিটিআরসি। সেই চিঠিতে সকল বিভাগের মতামত যাচাই শেষে অর্থ ছাড়ের কথা বলা হয়। যাচাই বা মতামত গ্রহণ না করেই কমিটির বৈঠকে সকল সদস্যকে স্বাক্ষর করতে বলা হলে বাধে বিপত্তি। বদলে দেওয়া হয় কমিটি। সাত দিনের মধ্যেই নতুন কমিটি গঠন করে অফিস আদেশ দেওয়া হয় ১৬ জুন। সেই কমিটি পরদিন নামকাওয়াস্তে বৈঠক করে তড়িঘড়ি করে ১৮ জুন যাচাই ও মূল্যায়ন কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। মূল্যায়নে জালিয়াতি করে টিএমএসের কার্যকারিতা ৯৯.৯৯ শতাংশ উল্লেখ করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৪ জুন কানাডিয়ান টিকেসির পক্ষে টাকা মঞ্জুরির জন্য পত্রও দেওয়া হয়।