...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের হাজার কোটির আবাসন প্রকল্পে ভাগ-বাঁটোয়ারায় শেষ

৬৬ পৌরসভায় অনিয়মের ছড়াছড়ি, ৫ বছরে অগ্রগতি ২৫ শতাংশ

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৮ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:১২
Shares
পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের হাজার কোটির আবাসন প্রকল্পে ভাগ-বাঁটোয়ারায় শেষ

দেশের ৬৬ পৌরসভায় কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসনসংকট নিরসনে ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রায় ৫ বছরে পুনর্বাসনের এই উদ্যোগ দুর্নীতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন ও টাইমস টুডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকল্পের রাজস্ব বাজেটে চালানো হয়েছে হরিলুট। গৃহস্থালি সরঞ্জাম, থালা-বাটি ও আসবাবপত্র কেনার নামে ৩৭ কোটি, টেলিফোন বিল বাবদ ২ কোটি, আইটি সোর্সিংয়ে সাড়ে ১৫ কোটি আর বিমা খাতে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দের হিসাব দেখানো হয়, যা রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার মতো। দুর্নীতির ছাপ দেখা গেছে জমি অধিগ্রহণেও।

গাইবান্ধা এলাকায় প্রায় ৩ একর জমি কিনতে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় আড়াই একর জমির দাম দেখানো হয়েছে ১১৫ কোটি টাকারও বেশি। নজিরবিহীন এই অঙ্কে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত স্পষ্ট। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসন প্রকল্পের কাজে চরম ধীরগতি দেখা গেছে। লক্ষ্য ছিল পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা। কিন্তু এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি আটকে আছে ১৭ শতাংশে। প্রকল্পটির অধীনে ৩ হাজার ৪০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা থাকলেও উঠে এসেছে অসংগতি ও হতাশার চিত্র।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ১ হাজার ৮৬০টি ফ্ল্যাটের কাজ চলছে। এটি মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬১ শতাংশ। তবে ১২ শতাংশ ফ্ল্যাট নির্মাণ একেবারেই অসম্ভব বলে জানানো হয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা জমি অধিগ্রহণ। প্রকল্পে ১৫.৬১ একর জমির প্রয়োজন ছিল। এ পর্যন্ত অধিগ্রহণ হয়েছে মাত্র ৫.৬৬ একর জমি। ৮টি পৌরসভায় এখনো কোনো জমিই পাওয়া যায়নি। ফলে সেখানে ভবন নির্মাণ পুরোপুরি অনিশ্চিত।

মাঠপর্যায়ে কাজের অবস্থাও বেশ নাজুক। প্রকল্প এলাকার দুটি স্থানে মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ১৮টি জায়গায় রয়েছে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা। প্রশাসনিক কাজেও ব্যাপক ধীরগতি। অনেক জায়গায় ঠিকাদাররা কাজ বন্ধ রেখেছেন। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও দক্ষ শ্রমিকের অভাব ছাড়াও কারিগরি দিক থেকে নানা ত্রুটি মিলেছে। কংক্রিটের কিউরিং ঠিকমতো হচ্ছে না। স্টিরাপ হুকের মানও বেশ খারাপ। এমনকি ভবনে নিজস্ব পানির ব্যবস্থাও রাখা হয়নি।

প্রকল্পের পরিবেশগত কাজও অনেক পিছিয়ে আছে। ৬৬টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও ড্রেনেজ নির্মাণের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। নিয়মিত হচ্ছে না পিআইসি ও পিএসসি সভা। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের একসঙ্গে বসবাসের অনীহাও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ভূমি জটিলতা নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া কাজের মান বাড়াতে কারিগরি তদারকি জোরদার করতে বলা হয়েছে। আগামীতে এমন প্রকল্প নেওয়ার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি ও মাটি পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জমি অধিগ্রহণ না করেই ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকার এই প্রকল্প তৎকালীন সময়ে পাস হয়। এ জন্য বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে সংকট। আট বিভাগের ৬৬টি পৌরসভার প্রকল্পে বাস্তবে অনেক জায়গায় জমিই নেই। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, বরিশালের গৌরনদী ও রাজশাহীর নওহাটা পৌরসভা জানিয়েছে, ভবন তোলার মতো জমিও নেই তাদের। এ ছাড়া ধামরাই, মির্জাপুর, চুয়াডাঙ্গা সদর, হারাগাছ ও পাটগ্রামেও একই সংকট। জামালপুরের মেলান্দহ ও কিশোরগঞ্জের ভৈরবে টাকা ছাড় হলেও স্থানীয়দের বাধায় জমি অধিগ্রহণ বাতিল হওয়ার মতো তথ্যও উঠে এসেছে।

যাদের ভাগ্যোন্নয়নে এ আয়োজন, সেই হরিজনরাই সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন। মানিকগঞ্জ ও যশোরের বাসিন্দারা নতুন ভবনে যেতে নারাজ। নতুন ভবনে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পরিবার থাকার সুযোগ পাবে। বাকি ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পরিবার শতবছরের কলোনি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়বে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ৪৫০টি অস্থায়ী ঘর তৈরি করার কথা থাকলেও চার বছরে হয়েছে ১৫০টির মতো। বাকিরা বাধ্য হয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

এদিকে, টাঙ্গাইল ও বগুড়ায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে আইএমইডি দেখেছে, বহুতল ভবন তোলা হলেও মূল নকশা ও প্রাক্কলনে পানির পাম্পের কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি! ৭ তলা ভবনে পানির ব্যবস্থা না থাকা চরম দায়িত্বহীনতা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের চুক্তি আটকে আছে ব্যয়ের জটিলতায়। অন্যদিকে, লিফট বসানো হলেও তার বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণের আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দরিদ্র পৌরসভাগুলোর কাঁধে।

নির্মাণকাজেও ধরা পড়েছে ভয়াবহ জালিয়াতি। কংক্রিটের সঠিক কিউরিং হয়নি, কলাম ও বিমে রডের অবস্থান সঠিক পাওয়া যায়নি। এমনকি রিবাউন্ড হ্যামার পরীক্ষায় কংক্রিটের নির্ধারিত মান ৩০ মেগাপ্যাসকেলও ওঠেনি বহু জায়গায়।

লুটপাটের আরেক নমুনা দেখা গেছে চুক্তিতে- ডিপিপিতে যে কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৪ লাখ টাকা, সেখানে চুক্তি করা হয়েছে মাত্র সাড়ে আট লাখ টাকায়! অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রাক্কলিত ব্যয় আট গুণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল। তদারকির জন্য ৩৬টি সভা হওয়ার নিয়ম থাকলেও চার বছরে হয়েছে মাত্র ৫টি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, বড় প্রকল্পগুলোতে আগে থেকেই প্রকৌশলগত কিছু ভুল ইচ্ছে করেই করা হয়ে থাকে। চিন্তা থাকে কীভাবে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা যায়। তা না হলে ৭ তলা ভবন ডিজাইন করার পর পানির পাম্পের বাজেট না থাকার কথা নয়-এতে সতর্ক হওয়া দরকার। তবে নতুন করে বাজেট বাগানোর সুকৌশল প্রায় সবখানেই দেখা যাচ্ছে। উচিত হবে এর ভেতরের খবর বের করা। দেখা যাবে, নিখুঁতভাবে একটা সাজানো গল্প রয়েছে। বিষয়টি দ্রুত জবাবদিহি আর নজরদারির আওতায় আনার দাবিও জানান ড. আদিল মোহাম্মদ খান।

এ বিষয়ে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মীর্জা ইফতেখার বলেন, মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের ত্রুটি শুধরে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট বরাদ্দ বা ভাড়া কেমন হবে-সে বিষয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি হয়নি।

২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে ২০২৭ সাল করা হলেও চার বছরে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মোটে ২৫ শতাংশ। খরচ হয়েছে মাত্র ১৯৩ কোটি টাকা। ১৫৬টি প্যাকেজের মধ্যে ১০২টির কাজই শুরু করা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে দেশের পৌরসভাগুলোতে কর্মরত সুবিধাবঞ্চিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।