দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে একদিন ভিটেমাটি আর স্বজনদের ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় মসৃণ হয় না। কারও ভাগ্যে জুটেছে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, কেউবা কাজ হারিয়ে বা কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করে ফিরেছেন শূন্য হাতে। জমানো পুঁজি হারিয়ে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরে তারা পড়েছিলেন চরম অনিশ্চয়তায়। তবে সেই অন্ধকারের পথেই আশার প্রদীপ হয়ে এসেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অধীন বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় পরিচালিত ‘রেইজ’ (রিকভারি অ্যান্ড এডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট) প্রকল্প।
বদলেছে জীবন
রাজশাহীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাহীনুর বেগম। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন পরিবারের অস্বচ্ছলতা দূর করতে। কিন্তু সেখানে মেলে নির্যাতন আর অমানুষিক শারীরিক খাটুনি; অসুস্থ হয়ে খালি হাতে ফিরতে হয় দেশে। ২০২৩ সালে স্থানীয় প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারে এসে নাম নিবন্ধন করে কাউন্সেলিং ও ১৩,৫০০ টাকার সরকারি প্রণোদনা পান তিনি। সেই টাকা দিয়ে কেনা সেলাই মেশিনেই আজ নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। পোশাকে সেলাইয়ের ছন্দে কেবল পরিবারে স্বচ্ছলতাই ফেরেনি, শাহীনুর আজ নিজের এলাকার অন্য নারীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
একইভাবে দীর্ঘ ২০ বছর লেবাননে কাটিয়ে করোনা মহামারির থাবায় কাজ হারিয়ে শূন্য হাতে কুমিল্লায় ফিরেছিলেন আব্দুর রহিম। দিনমজুরের কাজ করে যখন সংসার চলছিল না, তখন ২০২৪ সালের শুরুতে ‘কুমিল্লা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার’-এর সন্ধান পান। প্রকল্পের প্রণোদনা আর নিজস্ব সাহসে কেনা ভ্যানগাড়িতে শাকসবজি ফেরি করে বিক্রি করা রহিম এখন কুমিল্লার গোল মার্কেট এলাকায় পরিচিত মুখ। তিনি বলেন, ‘চরম দুঃসময়ে প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা ও সঠিক দিকনির্দেশনাই আমাকে পরিবার নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।’
জীবনসংগ্রামের গল্পটি নরসিংদীর সেমল ভূঁইয়ার ক্ষেত্রেও সমান সত্য। সৌদি আরবে এসি লাগানোর কাজ করতে গিয়ে উঁচু ভবন থেকে পড়ে মারাত্মক আহত হওয়ার পর মাত্র ২৭ দিনের মাথায় তাকে দেশে পাঠায় কোম্পানি। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সেমলকে প্রবাসী ওয়েলফেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে রেফার করা হয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে। চিকিৎসার জন্য বোর্ড থেকে পান ৭৪ হাজার টাকা এবং বীমা দাবির ৫০ হাজার টাকা। পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বিদেশফেরত হওয়ায় রেইজ প্রকল্প থেকে যৌথভাবে পান ২৭ হাজার টাকা প্রণোদনা। সব টাকা দিয়ে গড়ে তোলা তাদের মুরগির খামারে এখন ১,০০০ মুরগি রয়েছে, যেখান থেকে মাসে আয় আসছে অন্তত ৩০ হাজার টাকা।
রাজশাহীর শাহিনুর, কুমিল্লার রহিম বা সেমল ভূঁইয়ার মতো সারা দেশে প্রায় দুই লাখ ভাগ্যবিড়ম্বিত বিদেশফেরত কর্মীকে পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এই ‘রেইজ’ প্রকল্প।
বর্তমানে ৩৫ জেলায়
জানা যায়, করোনা মহামারি ও বিভিন্ন সংকটে চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরা কর্মীদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরাতে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যাত্রা শুরু করে প্রকল্পটি যার মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তবে মেয়াদ আরো বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩৫টি জেলায় অবস্থিত ‘প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার’-এর মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রবাসফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান ও উদ্যোগের এক বিস্তৃত চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে নিবন্ধিত মোট ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯৮ জন কর্মী নানামুখী সেবার আওতায় এসেছেন। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রত্যাগত প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে কৃষি খাত যেখানে সর্বোচ্চ ৪৭ হাজার ৫০৬ জন কর্মী যুক্ত হয়েছেন। এর পরেই রয়েছে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে ৩০ হাজার ৫৪১ জনের আত্মপ্রকাশ এবং ১৭ হাজার ৩২৭ জনের নতুন ব্যবসার উদ্যোগ। এ ছাড়া ৯ হাজার ৭৪২ জন গবাদিপশু পালন, ৮ হাজার ৪২১ জন ক্ষুদ্র ব্যবসা, ৪ হাজার ১৪৫ জন মৎস্য চাষ এবং ৮ হাজার ১৯৫ জন বিভিন্ন বেসরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন।
পুনর্বাসনের পাশাপাশি ১১ হাজার ৪৭৩ জন পুনরায় বিদেশে গমনের প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং ৯ হাজার ১৬৫ জন দিনমজুর ও ১ হাজার ৭২২ জন পেশাজীবী হিসেবে কাজে ফিরেছেন। সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ৩৩ হাজার ১৭৯ জন শুরুতে সম্পূর্ণ বেকার অবস্থায় থাকলেও প্রকল্পের কাউন্সেলিং ও সহযোগিতায় তারা নতুন পথের দিশা পাচ্ছেন। অন্যদিকে, দুর্ভাগ্যবশত ১,১৮২ জন কর্মী মৃত্যুবরণ করলেও সার্বিক এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সরকারি সহায়তা পেলে প্রবাসফেরত ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা কত দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে আবারও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।
বিভিন্ন পেশায় যুক্ত
এদিকে, ইতোমধ্যেই প্রায় দেড় লাখ কর্মী রেইজ প্রকল্পের আওতায় স্থায়ী কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, গবাদি পশু বা হাঁস-মুরগি পালন, ড্রাইভিং-টেইলারিং, কনফেকশনারি, স্যানিটারি,গার্মেন্ট পণ্য, ফার্মেসি.রাইস মিল, মোবাইল সার্ভিসিং, কাটিং মাস্টার, হোটেল, চায়ের দোকান, ফার্নিচার, ফলসহ নানা ধরণের ব্যবসা। এ ছাড়াও, প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি কর্মী যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। অনেকে আবার ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষকতা বা কারিগরি পেশাতেও নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। নির্ধারিত বাজেটের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকায় আরও অর্ধলক্ষাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীকে নতুন করে এই সেবার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তথ্য বলছে, প্রকল্পের এই অভাবনীয় সাফল্য ও শতভাগ বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের নিজস্ব সমীক্ষায় রেইজ প্রকল্পকে অন্যতম সফল ও অনুকরণীয় হিসেবে চিহ্নিত করে অন্যান্য দেশের জন্য ‘রোল মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্বব্যাংকের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হয়েছে প্রকল্পটিকে।
পরিচালনাসংশ্লিষ্টরা জানান, শূন্য হাতে ফেরা একজন প্রবাসীকে কেবল নগদ টাকা দেওয়াই সমাধান নয়; তাকে মানসিক কাউন্সেলিং দেওয়া, সঠিক খাতে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া এবং টেকসই আয়ের পথ তৈরি করে দেওয়াটাই মূল উদ্দেশ্য। আর সেই কাজটাই সফলভাবে সম্পন্ন করে ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রবাসীদের স্বপ্নপূরণের নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে ‘রেইজ’।
ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড এর প্রকল্প পরিচালক যুগ্ম-সচিব ড. এটিএম মাহাবুব-উল করিম টাইমস টুডেকে বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বিদেশফেরত কর্মীদের সঠিক ডাটাবেজ প্রণয়ন এবং তাদের পুনর্বাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে চলমান এই প্রকল্প।
প্রকল্প পরিচালক জানান, মূল প্রকল্পের বাজেট সাশ্রয় করে ২০ হাজার প্রবাস ফেরতকে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশে যে বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে প্রবাসে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকা ৯৮৫ জন কর্মীকে এনএসডিএ (NSDA)-র মাধ্যমে জাতীয় দক্ষতার সনদ প্রদান করা হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মোট ২ লাখ ৫৩ হাজার সুবিধাভোগীর সার্বিক অবস্থা ও কর্মসংস্থান তদারকিতে অনলাইন মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। পূর্বে বিদেশফেরতদের কেন্দ্র করে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যভাণ্ডার না থাকলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব হবে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং অবশিষ্ট ১০ হাজার ২৪ জন প্রার্থীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ বেকার কর্মীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। অতিরিক্ত ৫৩০০০ ফেরত প্রবাসীকে উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্তি করেছি। এ ছাড়াও ৩৫টি প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার স্থাপন করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সারা দেশে কর্মীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পেরেছি। প্রত্যেক সদস্যকে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
মাহাবুব-উল-করিম বলেন, ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া এসব কর্মীরা এখন স্বাবলম্বী হয়ে পরিবার নিয়ে ভালো আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র প্রকল্প হিসেবে ‘রেইজ প্রকল্প’ বিশ্বব্যাংকের এওয়ার্ড পেয়েছে। যা জাতি হিসেবে গর্বের। প্রকল্পটি অব্যাহত থাকলে আরও বিদেশফেরত কর্মীরা জীবিকা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত হবে লাখও কর্মী।

