তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইস্ক্রিমের কাছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) বাবদ প্রায় ৩৪ কোটি টাকা পাওনা আদায়ে আইনী পদক্ষেপ নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেই থেকে কোম্পানিটি ই-ভ্যাট রিটার্ন বন্ধ রাখায় বকেয়ার পরিমাণ গিয়ে পৌঁছেছে ১৩৪কোটিতে। ভ্যাট রিটার্ন বা দাখিলাপত্র না দেওয়ায় এনবিআরের কাছে প্রতিমাসে জরিমানাসহ কোম্পানির বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা করে, তবু যেন বিকার নেই কোম্পানিটির। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে সিদ্ধহস্ত লাভেলো কোম্পানি আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকলেও নতুন কি ফন্দি আঁটছে তা নিয়ে খোদ এনবিআরের কর্মকর্তারা শঙ্কিত।
সূত্র মতে, প্রতিষ্ঠানটি গত দুই বছর ধরে রাজস্ব প্রদান থেকে বিরত থেকে আমদানি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। আদালতে মামলা চলমান এমন অযুহাত দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অঞ্চলের পক্ষ থেকে এনবিআরের চেয়ারম্যান ও এটর্নী জেনারেলের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। এমনকি এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করে করদায়িতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে অনুরোধ জানানো হয়েছে ভ্যাট অঞ্চলের পক্ষ থেকে।
নথিপত্র বলছে, ঢাকা উত্তর ভ্যাটের আওতাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ফাঁকি ধরা পড়ে ৩৩কোটি ৭২লাখ ৯৯হাজার ২৭৫টাকা। এই টাকা আদায়ের জন্য শুনানি শেষে ঢাকা উত্তর ভ্যাট কার্যালয় মূসক আইন ২০১২ এর ৭৩(২) অনুযায়ী চূড়ান্ত দাবিনামা কোম্পানির কাছে প্রেরণ করে ২০২৪ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি। এর প্রেক্ষিতে লাভেলো কোম্পানি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে, রিট পিটিশন নং-৬৬৯৬/২০২৪। একই বছরের জুন মাসে ভ্যাট উত্তর মূসক আইনের ৭৩(১) ধারায় ৩৮কোটি ২৭লাখ ৭৪হারার ৮৮৫টাকার নতুন দাবি নামা তৈরি করে নোটিশ প্রেরণ করে। এর প্রেক্ষিতে কোম্পানিটি আরেকটি রিট পিটিশন দায়ের করে যার ক্রম হচ্ছে ৬৯২৪/২০২৪। এরপরও কোম্পানিটি এনবিআরের দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করায় কোম্পানির ব্যাংক একাউন্ট স্থগিত ও ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিন) লক করে দেয়া হয়।
সূত্রে আরও জানা যায়, লাভেলোর দুটি রিট মামলার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট উচ্চ আদালত শুনানি শেষে অন্তর্বর্তী আদেশ প্রদান করে। প্রথম রিটের আদেশে উচ্চ আদালত ঢাকা উত্তর ভ্যাট অফিসকে লাভেলোর ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থে সকল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে উদ্যোগ গ্রহন করতে বলে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে এনবিআরের দাবিকৃত অর্থের ৫ শতাংশ অর্থ তিন কার্য দিবস অর্থাৎ ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেয় আদালত। একই ভাবে পরে রিটের জন্য ৫ শতাংশ অর্থ জমা প্রদান অর্থান সর্বমোট ১০শতাংশ অর্থ প্রদানের নির্দেশনা দেয় আদালত। বাকি ৯০শতাংশ পাওনা তিন মাসের মধ্যে যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা প্রদানের পর তার প্রত্যয়ন পত্র সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসে প্রমাণক প্রদানের নির্দেশ দেয় অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের বিন পুনরায় বন্ধ করে দেয়ার এখতিয়ার ভ্যাট অফিসকে প্রদান করা হয়।
নথি থেকে আরও জানা যায়, লাভেলো কোম্পানি বকেয়ার ৯০শতাংশ অর্থের একটি পয়সাও জমা না দিয়ে বরং সুপ্রীম কোর্টে আপিল করে দায়ের করে যার নম্বর হচ্ছে ৩৩৩৩/২০২৪। শুনানির জন্য একই বছরের অক্টোবরের ২১ তারিখ দিন ধার্য করা হয়। ফলে আপীল বিভাগ এনবিআরের কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ দেয়। দুপক্ষের যুক্তিতর্ক ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি আপিলের নিষ্পত্তি হয়। মামলা ঢাকা উত্তর ভ্যাট পরিচালনা করলেও ২০২৫সালের অক্টোবর মাস থেকে এই কোম্পানিটির ভ্যাট অঞ্চল পরিবর্তন হয়ে নতুন অফিস ময়মসিংহে স্থানান্তরিত হয়।
নথিতে উল্লেখ রয়েছে, লাভেলো প্রতিষ্ঠানটি জুলাই ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারী ২০২৫ পর্যন্ত ভ্যাট রিটার্ন না দেওয়ায় ১০কোটি ৪৬লাখ ২৯হাজার ৭৬৪টাকার কর ফাঁকি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মার্চ ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত দাখিলাপত্র দাখিল না করায় বা রাজস্ব পরিশোধ না করায় ৫২কোটি ২৫লাখ ২২হাজার ২৯১টাকা কর ফাঁকির মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। সবমিলিয়ে লাভেলোর বিরুদ্ধে অপরিশোধির রাজস্ব বাবদ এনবিআরের পাওনা ১৩৪কোটি টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানিটি ৯কোটি ৪৫লাখ ৯৫হাজার ৮২টাকা বিভিন্ন সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়কারী কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে।
ভ্যাট রিটার্ন জমা না দেয়ার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ই-ভ্যাট সিস্টেমে পূর্ববর্তী কর মেয়াদের রিটার্ন সাবমিট না করলে পরবর্তী কর মেয়াদের রিটার্ন সাবমিট করা সম্ভব হচ্ছে না। পূর্ববর্তী মাসসমূহের রাজস্ব যেহেতু আদালতে বিচারাধীন রয়েছে তাই চলমান মাসসমূহের রাজস্ব জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিমাসে ৩-৫ কোটি টাকা করে রাজস্ব বকেয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, এনবিআরের কর্মকর্তা বলেন, এই কোম্পানির সুনামে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ফলে রাজস্ব কিভাবে ফাঁকি দেওয়া যায় সেবিষয়ে সিদ্ধহস্ত এই কোম্পানি। ই-ভ্যাট সিস্টেম শুধুমাত্র অজুহাত।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ময়মনসিংহের কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) এস.এম সোহেল রহমান টাইমস টুডেকে বলেন, লাভেলো ভ্যাট রিটার্ন বন্ধ রাখায় প্রতিদিনই এনবিআরের কাছে তাদের বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। এর আগে যে রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়েছে সেজন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থান নেওয়া হয়েছে, তা আদালত বিচারাধীন রয়েছে। বকেয়া আদায়ের জন্য এনবিআর চেয়ারম্যান ও এটর্নি জেনারেলের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. একরামুল হকের সঙ্গে মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

