দুই দশকেরও বেশি সময় পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত প্রস্থানের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপনে রাজধানী বাগদাদসহ বিভিন্ন শহরে আনন্দমিছিল ও সামরিক কুচকাওয়াজ করেছেন সাধারণ ইরাকিরা।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) আংশিক স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের এরবিলের একটি বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন বাহিনীর শেষ দলটির চলে যাওয়ার মাধ্যমে এই পূর্ণ প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। এই যুদ্ধ দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বিশৃঙ্খলা ডেকে এনেছিল, যে ক্ষত থেকে ইরাক এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে তাড়ানোর এই আন্দোলনকে তেহরান এবং তার মিত্ররা তাদের একটি বড় বিজয় হিসেবে প্রশংসা করেছে। তবে উল্লেখ্য যে, এই সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিটি ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলেই হয়েছিল এবং বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রতিবেশী ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সত্ত্বেও সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করল।
আনন্দ ও নিরাপত্তার শঙ্কা
মার্কিন প্রস্থান উপলক্ষে বাগদাদ এবং শিয়াদের পবিত্র শহর নাজাফের রাস্তায় রাস্তায় সামরিক যান নিয়ে কুচকাওয়াজ করে ইরাকি বাহিনী। এই প্রস্থানকে স্বাগত জানিয়ে ৭০ বছর বয়সী বাগদাদের বাসিন্দা আহমেদ সালাহ বলেন, এটি আমাদের বুক আনন্দে ভরে দিয়েছে, তিনি নিজেকে যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন বলে অনুভব করছেন।
তবে সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কাও রয়েছে। আহমেদ সালাহ বলেন, এখন সময় এসেছে শক্তিশালী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণ করার এবং মাটি, আকাশ ও পানির ওপর আমাকে এবং আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার একমাত্র দায়িত্ব যেন সরকারের হাতেই থাকে।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে ইরাকি একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দেশটিতে আগ্রাসন চালায় মার্কিন বাহিনী, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার সূচনা হয়। এর আগে ২০১১ সালের শেষের দিকে মার্কিন সেনারা একবার ইরাক ছেড়ে চলে গেলেও, ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিরা ইরাকের এক তৃতীয়াংশ দখল করে হিংস্র শাসন কায়েম করার পর তিন বছর না যেতেই তারা আবার ফিরে আসে।
এই যুদ্ধে সাড়ে চার হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যা আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত সেনাসদস্যদের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া ‘ইরাক বডি কাউন্ট’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতে দুই লাখের বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
সন্ত্রাস দমনের লড়াই অব্যাহত থাকবে
পেন্টাগন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার জোটের অংশীদাররা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রেজল্ভ’-এর সমাপ্তি ঘটিয়েছে। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা তাদের ইরাকি অংশীদারদের লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় দেশেরই মিত্র হিসেবে পরিচিত ইরাক এখন দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আইএসের অবশিষ্ট অংশগুলোকে দমন করতে নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এক বিবৃতিতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালেহ আল-জাইদি বলেছেন, আন্তর্জাতিক জোটের মিশনের সমাপ্তির অর্থ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের শেষ নয়, বরং এটি এমন এক পর্যায়ে রূপান্তর যেখানে ইরাক তার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করছে।


