ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট বা শিপিং রুট নিরাপদ করতে উপকূলীয় অঞ্চলে হামলা অথবা বহুমুখী ফ্রন্টে একই সাথে আক্রমণের বিকল্পগুলো নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা এই তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছয় ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের যেকোনো সময় শুরু হতে যাওয়া এই অভিযানটি রিয়াদের তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি স্থলবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে এবং এতে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো বিমান সহায়তা প্রদান করবে।
সূত্রগুলো জানায়, ইয়েমেনে রিয়াদের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে এবং কিছু আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা প্রদান করছে, তবে সৌদি মিত্রদের এই লড়াইয়ে সরাসরি কোনো সমরে অংশ নেওয়ার কথা নেই।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে ২০১৫ সালে সৌদি আরব একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, চলতি বছর ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হুথিরা সৌদি জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করলে সেই শান্ত অবস্থা ভেঙে যায়।
গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগে কখনও প্রকাশ না পাওয়া এই সৌদি সামরিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো—গত মাসে হুথিদের দ্রুত অগ্রাভিযানের ফলে তারা উপকূল ধরে এগিয়ে গিয়ে কৌশলগত বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়, সেই দখল পুনরুদ্ধার করা।
উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আক্রমণের জন্য সৌদি আরব দুটি সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করছে: একটি হলো বাব এল-মান্দেব এলাকার আশপাশে সুনির্দিষ্টভাবে সীমিত আক্রমণ চালানো, আর অন্যটি হলো একটি বৃহত্তর আক্রমণ যার মধ্যে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ এবং আল-জউফ প্রদেশের ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে একযোগে সমন্বিত হামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অভিযানের পরিধির ওপর নির্ভর করে এতে ১ লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনাকে মাঠে নামানো হতে পারে।
সৌদি ও ইয়েমেনি সরকার, হুথি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রদের কাছে এই পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
উল্লেখ্য, বাব এল-মান্দেব প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব বাব এল-মান্দেব হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ বহির্গমন পথ, যা ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট। ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প রুট হিসেবে এই বছর এর গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় কর্মকর্তা জানান, রিয়াদ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, হুথিরা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লিভারেজ বা প্রভাব বিস্তার করে বাব এল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে দিলে তারা হুথিদের সাথে কোনো নতুন ইয়েমেনি শান্তি আলোচনায় প্রবেশ করতে পারবে না।
সৌদি প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ওই ছয় ব্যক্তি অভিযানের সুনির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি, তবে তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী আগামী এক সপ্তাহ থেকে শুরু করে নভেম্বরের শুরুর দিকে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যেকোনো সময় এটি শুরু হতে পারে।
সৌদি আরবের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেছেন, তিনি আশা করছেন এবারের আক্রমণটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং ২০১৪ সালে জঙ্গিদের উৎখাত করার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন পূর্বের অভিযানের তুলনায় আকারে অনেক সীমিত হবে। তিনি আরও বলেন, তারা যেমন হুথিদের সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করতে চায়, তেমনি বাব এল-মান্দেব বরাবর এলাকাগুলো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। আদর্শগতভাবে এটি উপকূলীয় অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে এবং স্বাভাবিক সামুদ্রিক ট্রাফিক ফিরিয়ে আনতে একটি সীমিত পরিসরের অপারেশন হবে।
উল্লেখ্য, গত তিন বছরে লেবাননে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে দুর্বল করে দেওয়ার পর থেকে হুথিরা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর মিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাস নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল আক্রমণ এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের পর থেকে সংঘাতে নিমজ্জিত এই অঞ্চলে সৌদি নেতৃত্বাধীন এই অভিযান একটি নতুন সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।


