...|...|...

বিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে ইরানের নতুন ছক: ফরেন অ্যাফেয়ার্স

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৮
Shares
মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে ইরানের নতুন ছক: ফরেন অ্যাফেয়ার্স

ছবি: এআই।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমাতে দেশটির ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে ইরান। এ লক্ষ্য অর্জনে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত করা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো এবং মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করতে পারে তেহরান। এমনকি সরাসরি উসকানি ছাড়াও হামলার পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব কথা বলেছেন ইরান বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আয়াতোল্লাহি তাবার।

১ অক্টোবর প্রকাশিত ‘হোয়াই ইরান এসকেলেটস: তেহরানস স্ট্র্যাটেজি টু ড্রাইভ আমেরিকা আউট অব দ্য মিডল ইস্ট’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকার কৌশলে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার খরচ এতটা বাড়িয়ে দিতে চায়, যাতে ওয়াশিংটনকে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ সেনা প্রত্যাহার করতে হয়।

তাবারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারে ইরান। তবে এটি লেখকের কৌশলগত মূল্যায়ন; ইরানের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এসব পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে- এমন দাবি নিবন্ধে করা হয়নি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ইরানের কৌশলে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

তাবার মনে করেন, ইরান এই কৌশলকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। শুধু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করাই নয়, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল উৎপাদনকেন্দ্র, বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথিদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে লোহিত সাগরেও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা হতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকের মতে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনকে আরও বেশি সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য করা।

ইরানের কৌশলগত পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরাসরি মার্কিন সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা। তাবারের মতে, ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং গোয়েন্দা অবকাঠামোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে পারে।

তিনি ইরানের কৌশলকে এমন একটি ধারাবাহিক ক্ষয়সাধন প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে বড় ধরনের যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়েও সীমিত আকারের হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করা হয়।

এ ক্ষেত্রে ইরানের লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করা এবং ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া। ওয়াশিংটন যদি মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন রেখেও মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে হতে পারে।

তবে এ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উল্টো হামলা বাড়লে ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে পারে।

সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে মনে করেন তাবার। এ ক্ষেত্রে সাইবার অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। পানি সরবরাহ, জ্বালানি ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে পারলে সামরিক সংঘাতের বাইরেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করা সম্ভব।

তাবারের বিশ্লেষণে, ইরান তার প্রচলিত সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে অসমমিত যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পরিবর্তে এমন ক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা, যেখানে তুলনামূলক কম ব্যয়েও বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব।

তবে সম্ভাব্য সাইবার হামলার বিষয়ে লেখকের আলোচনা থেকে প্রতিটি হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা যায় না। নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে আলাদা প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন।

তাবারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ এখন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে আবার সামরিক হামলা চালাতে পারে।

লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ অবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে পূর্ববর্তী পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া এবং আলোচনার সময় সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার অভিজ্ঞতা। ফলে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এমন ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে, শুধু আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

এ কারণে ইরানের নেতৃত্ব এখন প্রতিপক্ষকে কেবল প্রতিরোধ করার বদলে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরির পথ বেছে নিতে পারে। তাবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব মেনে নিতে বাধ্য করা না গেলে সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তাবার। তার মতে, ইরানের নেতৃত্ব মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সংঘাত থেকে সরে দাঁড়ালেও ভবিষ্যতে আবার শক্তি সঞ্চয় করে হামলা চালাতে পারে।

এ কারণে তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি বজায় রাখতে এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী হতে পারে। ইরানের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক হামলা ঠেকানো নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত ভূমিকা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করা।

তবে সংঘাত বাড়ানোর কৌশলে ইরানের নিজেদেরও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ দিতে পারে।

তাবারও সতর্ক করেছেন, ইরান যদি অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো তার লক্ষ্য, উল্টো সেটিই আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তাবারের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, ইরানের নেতৃত্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহাবস্থানের চেয়ে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে রাখার কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, সাইবার অভিযান এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যবহার- সবই এই কৌশলের সম্ভাব্য অংশ।

ইরানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের প্রভাব বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান স্বীকার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করা।

কিন্তু এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা, আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপের ওপর। সংঘাত বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করার চেষ্টা ইরানের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে, আবার একই সঙ্গে আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।