ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা চীন থেকে আমদানি করা বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে মাঝারি পাল্লার উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। ইরানের তৈরি ‘খাইবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে নিজেদের একটি সংস্করণ তৈরির এই উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। প্রস্তাবিত ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা হতে পারে প্রায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর) নতুন এক প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন থেকে আনা যন্ত্রাংশের মাধ্যমে হুথিরা এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করেছে, যা ইরানের উন্নত নির্ভুল-নির্দেশিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খাইবার শেকানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে হুথিদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কার্যক্রম ঠিক কত দূর এগিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সিএআর-এর অনুসন্ধানে ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষের জব্দ করা দুটি চালানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে আটক করা চালান দুটিতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্যের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম লুকানো ছিল। ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসব চালানসংক্রান্ত তথ্য পায় সংস্থাটি।
জব্দ করা পণ্যের মধ্যে ছিল বিশেষভাবে তৈরি ধাতব যন্ত্রাংশ, ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর ও মূল কাঠামোর অংশ, উড্ডয়নের সময় ক্ষেপণাস্ত্রকে স্থিতিশীল রাখার ফিনস এবং কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট মোটরের উপাদান। এ ছাড়া উচ্চ তাপমাত্রা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দিষ্ট অংশ রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত তাপ-প্রতিরোধী উপাদান, পরীক্ষার সরঞ্জাম ও বিভিন্ন কাঁচামালও পাওয়া গেছে।
চালানের নথিপত্রে চীনের একটি নির্ভুল ধাতব যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বিশেষায়িত অ্যারোস্পেস বা মহাকাশ প্রযুক্তিতে ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্রাংশ তৈরির সরবরাহকারী হিসেবে প্রচার করে। তবে CAR-এর প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এই তথ্য থেকে চীনা সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে হুথিদের অস্ত্র উৎপাদনের সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এর মাধ্যমে চীন সরকার সরাসরি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
ইরানের খাইবার শেকান একটি কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২২ সালে তেহরানে এটি প্রথম প্রদর্শন করা হয়। তুলনামূলকভাবে সহজে পরিবহন ও দ্রুত মোতায়েনের উপযোগী এই ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি।
বিশ্লেষকদের মতে, খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে ওয়ারহেড মূল ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব ছোট ইঞ্জিনের সাহায্যে গতিপথ সামঞ্জস্য করতে পারে। এর ফলে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য সেটিকে প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে।
হুথিদের সংগ্রহ করা যন্ত্রাংশের মধ্যে খাইবার শেকান-শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানিচালিত মোটরের অংশ শনাক্ত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে জব্দ করা সব যন্ত্রাংশ যে একই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ব্যবহার করা হবে, কিংবা হুথিরা ইতিমধ্যে খাইবার শেকানের পূর্ণাঙ্গ অনুকরণ তৈরি করেছে, তা নিশ্চিত নয়।
দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের অস্ত্রভান্ডারে ইরানের তৈরি বা ইরানি প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আগে তাদের কাছে পাঠানো অনেক অস্ত্র ইয়েমেনে এনে সংযোজন ও ব্যবহারের উপযোগী করা হতো।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিরা নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ বিস্তারের চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশার মতে, স্থানীয়ভাবে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সফটওয়্যার উন্নয়ন, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সংগ্রহ ও চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক হুথিদের আরও স্বনির্ভর হতে সহায়তা করছে।
জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও হুথিদের কাছে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে চীনা প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারীদের মাধ্যমে হুথিদের কাছে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর তথ্য উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে চীন থেকে আসা বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম, ড্রোন ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ জব্দের ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার প্রতিটির সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির নির্দিষ্ট প্রকল্পকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রস্তাবিত ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা যদি প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার হয়, তাহলে ইয়েমেনের বিভিন্ন সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল থেকে সৌদি আরবের বিস্তৃত এলাকা এবং ইসরায়েলের বহু লক্ষ্যবস্তু এর আওতায় আসতে পারে। এমন সক্ষমতা অর্জন করলে হুথিদের হাতে দূরপাল্লার হামলার আরও একটি বিকল্প তৈরি হবে।
মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের তুলনায় বড় ওয়ারহেড বহন করতে পারে এবং দীর্ঘ দূরত্বে দ্রুত আঘাত হানতে সক্ষম। ফলে এ ধরনের অস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ঘোষিত বা সম্ভাব্য পাল্লা থেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। এর জন্য কার্যকর নির্দেশনাব্যবস্থা, পরীক্ষিত নকশা, নির্ভরযোগ্য উৎপাদন, উৎক্ষেপণ সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে অস্ত্রটির কার্যকারিতার প্রমাণ প্রয়োজন।
হুথিদের কাছে চীনা যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর ঘটনা বেইজিংয়ের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিছু যন্ত্রাংশ বেসামরিক শিল্পেও ব্যবহার করা যায়; অন্য কিছু উপাদান ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি হতে পারে।
কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের গবেষণাপ্রধান মাইকেল নাইটসের মতে, চীনা যন্ত্রাংশের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সক্ষমতা বা সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এটি তাঁর মূল্যায়ন; চীনা সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
অন্যদিকে, চীন দাবি করে, ইয়েমেনের হুথিদের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে হুথিদের হামলার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন সরবরাহকারী ও চীনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগও তুলেছে।
সব মিলিয়ে, চীনা যন্ত্রাংশ সংগ্রহের ঘটনা হুথিদের অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে তারা সত্যিই ইরানের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে পূর্ণাঙ্গ মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আরও তথ্য ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।


