আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে এবং ভোট প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কোন কোন উপায় বা কৌশল অবলম্বন করতে পারে—তা নিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইন বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা তুলে ধরে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব রাজ্যগুলোর হাতে রয়েছে এবং এর আগে আদালত ট্রাম্পের অনেক উদ্যোগের আইনি বৈধতা আটকে দিয়েছে, তবুও আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত ও বিঘ্ন নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। হোয়াইট হাউস অবশ্য দাবি করেছে যে তাদের লক্ষ্য কেবল নির্বাচনী সততা এবং ভোটিং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে নির্বাচন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার ভিত্তিতে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন বানচাল বা হস্তক্ষেপের ৯টি সম্ভাব্য ঝুঁকির দিক তুলে ধরা হয়েছে:
১. নির্বাচন জালিয়াতি বা ত্রুটিপূর্ণ ইভিএমের অভিযোগ তোলা
অতীতে পরাজয়ের পর ট্রাম্প যেভাবে ভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ঠিক তেমনি এবারও অস্পষ্ট বা প্রমাণহীন জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারেন তার সমর্থকরা।
২. নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা
ফলাফল পরিবর্তন বা বিলম্বিত করতে নির্বাচনী কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা এবং রাজ্য কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পথ বেছে নিতে পারে প্রশাসন। ২০২০ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জর্জিয়া বা অন্যান্য রাজ্যে যেভাবে প্রশাসনের তরফ থেকে ফলাফল উল্টানোর চেষ্টা হয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩. ব্যালট বা ভোটিং সরঞ্জাম জব্দ করা
আদালতের ওয়ারেন্ট বা সমনের অজুহাতে ফেডারেল এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যালট পেপার, ভোটিং মেশিন বা নির্বাচনী রেকর্ড জব্দ করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। এর ফলে ভোট গণনায় বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি চেইন অফ কাস্টডি নষ্ট হতে পারে।
৪. ফেডারেল নির্বাচন মনিটরদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ
বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে ১,০০০ ফেডারেল নির্বাচন মনিটর নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সমালোচকদের শঙ্কা, এই মনিটররা প্রথাগত পর্যবেক্ষণের সীমা অতিক্রম করে ভোটারদের জিজ্ঞাসাবাদ বা কেন্দ্রে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করতে পারে।
৫. ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি আইসিই বা অভিবাসন উপস্থিতি
অভিবাসন ও শুল্ক এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির সশস্ত্র এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে মোতায়েন করার জল্পনা রয়েছে। এতে অভিবাসী ও ডেমোক্র্যাট সমর্থক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি বা উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
৬. ভোটকেন্দ্রে সেনা মোতায়েনের শঙ্কা
দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘ইনসারেকশন অ্যাক্ট’ বা বিদ্রোহ দমন আইন প্রয়োগ করে ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি বা চারপাশে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে কি না—তা নিয়ে জল্পনা চলছে। যদিও পেন্টাগন ও যৌথ বাহিনীর প্রধান জানিয়েছেন যে ভোটকেন্দ্রে সেনা পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই, তবে এই ধরনের পদক্ষেপ তীব্র আইনি চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের জন্ম দেবে।
৭. জরুরি অবস্থা ঘোষণা
ট্রাম্পের কট্টর মিত্র ও সমর্থকরা ভোটার জালিয়াতির অভিযোগ তুলে দেশজুড়ে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ভোট গণনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন বা হ্যান্ড কাউন্ট (হাতে ভোট গণনা) বাধ্যতামূলক করার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
৮. নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফেডারেল তদন্ত ও চার্জশিট
যেসব রাজ্য অ-নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি বা জেনেশুনে সুযোগ দিয়েছে বলে প্রশাসন মনে করে, সেই রাজ্যগুলোর প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আইনি তদন্ত বা বিচারিক হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা।
৯. কংগ্রেস কর্তৃক জয়ী প্রার্থীদের শপথ গ্রহণে বাধা বা বিলম্ব
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ী হওয়া ঠেকাতে বা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে কংগ্রেসের রিপাবলিকান নেতৃত্বকে নানা কৌশলে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। এর ফলে নতুন কংগ্রেস গঠিত হওয়ার প্রাক্কালে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পৃথক হস্তক্ষেপের চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো—একের পর এক আইনি লড়াই, তদন্ত এবং বিতর্ক পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে চরম অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।


