...|...|...

বিশ্ব

হিমালয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ লাখ মানুষ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১১:২৫
Shares
হিমালয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ লাখ মানুষ

ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের কারণে হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে উত্তর নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত ও ভারতের উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় তিন লাখেরও বেশি মানুষ ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর বিস্তার প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে হিমবাহ থেকে সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমন এলাকায় নির্মাণকাজ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণাটি বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার পর প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, বাস্তবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, বিশ্লেষণে হিমালয়ের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বিবেচনা করা হয়েছে; আশপাশের একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ব্রিটেন, নেপাল ও ভারতের নয়জন বিজ্ঞানী এ গবেষণায় অংশ নেন। তারা হিমালয়ের নদীগুলোর দুই পাশের ৫০ কিলোমিটার এলাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬০টি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আশপাশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন। এতে পর্যটন অবকাঠামো, আবাসন, সড়ক এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের চিত্র উঠে এসেছে।

নদীতীরের বসতি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

নেপালের পর্যটননগরী পোখরা অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঝুঁকির একটি উদাহরণ। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরটির পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। তবে শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সেতি গণ্ডকি নদীর তীরে গড়ে ওঠা পুরোনো ভবনগুলো এখন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

পোখরার মেয়র ধনরাজ আচার্যের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ভবন নদী থেকে মাত্র পাঁচ মিটার দূরে অবস্থিত। নতুন বিধিমালায় নদী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ভবন নির্মাণের নির্দেশনা থাকলেও পুরোনো স্থাপনাগুলো কোথায় সরানো হবে, তা নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

পোখরার উত্তরে অন্নপূর্ণা ট্রেকিং এলাকাতেও নদীর তীর ঘেঁষে বসতি ও পর্যটন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে সেখানকার কয়েকটি বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় হোমস্টে ব্যবসায়ী ফুরপা শিরিং লামা জানান, সাধারণত পর্যটন মৌসুমে তার ২০টি কক্ষই অতিথিতে পূর্ণ থাকে। কিন্তু এবার মাত্র পাঁচটি কক্ষে পর্যটক রয়েছেন। ৪০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে এমন দুর্যোগ আগে দেখেননি বলেও জানান তিনি।

গবেষণার প্রধান লেখক ও লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসনের মতে, নদী উপত্যকাগুলোতে জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এখন উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা আগামী কয়েক দশক ধরে এসব এলাকার দুর্যোগঝুঁকিকে প্রভাবিত করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে হিমবাহ, তুষারাবৃত ভূমি ও স্থায়ী বরফে ঢাকা অঞ্চল দ্রুত গলে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধস, পাথরধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

হিমবাহ গলে পানি জমার কারণে পাহাড়ি হ্রদগুলোর আয়তনও বাড়ছে। একপর্যায়ে পানির অতিরিক্ত চাপের কারণে এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির কারণেও ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে।

প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। গত আগস্টে নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ১১ অক্টোবর বুধি গণ্ডকি নদীর বন্যায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পাঁচটি সেতু ভেসে যায় এবং পাঁচজন নিখোঁজ হন।

গবেষণায় নদী ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানির স্তর থেকে ৫০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে ২৬ আগস্ট রাসুয়া জেলায় বন্যার সময় কোনো কোনো এলাকায় পানির উচ্চতা ৭০ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ফলে গবেষণার নির্ধারিত সীমার বাইরেও অনেক স্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে।

নির্মাণবিধি কার্যকরে দুর্বলতা

নেপালের বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নির্মাণবিধি যথাযথভাবে কার্যকর না করায় হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। নদীর তীরবর্তী নিচু জমিতে হোটেল, বাজার, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নদী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মও মানা হচ্ছে না।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ সংস্থা জানিয়েছে, রাসুয়া-ভোটেকোশি এলাকায় নদীর তীর থেকে ১৫ মিটারের মধ্যে বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যান্য নদী উপত্যকায়ও একই ধরনের বিধিনিষেধ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ভারতের উত্তরাখণ্ডেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। পরিবেশকর্মী অনুপ নওটিয়ালের অভিযোগ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে নদীতীরবর্তী নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় জমির ব্যবহার ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে গত ১২ অক্টোবর নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার।

এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে বলেছেন, জলবায়ু সংকট তৈরিতে নেপালের ভূমিকা সামান্য হলেও এর বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটিকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কঠোর নির্মাণবিধি এবং ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা জরুরি। তবে হিমালয়ের মতো ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তাই অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে নিরাপদ স্থানে বসতি গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।