মহাবিশ্বের রহস্যময় অন্ধকার পদার্থ বা ডার্ক ম্যাটারের বড় অংশ অতি বিশাল কৃষ্ণগহ্বর দিয়ে গঠিত- বিজ্ঞানীদের এমন ধারণার পক্ষে সমর্থন মিলছে না নতুন এক গবেষণায়। সূর্যের ভরের ১০০ বিলিয়ন গুণেরও বেশি ভরসম্পন্ন কৃষ্ণগহ্বর ডার্ক ম্যাটারের উল্লেখযোগ্য অংশ হতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন গবেষকেরা।
মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮৫ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার বলে ধারণা করা হয়। এটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব ছায়াপথের ঘূর্ণন ও গঠন ব্যাখ্যা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডার্ক ম্যাটার না থাকলে ছায়াপথের দৃশ্যমান পদার্থের আচরণ বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলানো কঠিন হতো।
তবে ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা এখনো অমীমাংসিত। কৃষ্ণগহ্বরের বিপুল ভর এবং শনাক্ত করার জটিলতার কারণে একসময় বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, এগুলো হয়তো ডার্ক ম্যাটারের একটি সম্ভাব্য উৎস।
নতুন গবেষণায় বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে অতি বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের সম্ভাব্য ভূমিকা। এসব কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের ভরের ১০০ বিলিয়ন গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা একটি সম্পূর্ণ ছায়াপথের ভরের চেয়েও বেশি হতে পারে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ধরনের কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাননি। বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে ভারী কৃষ্ণগহ্বরগুলোর একটির ভর সূর্যের প্রায় ৩৬ বিলিয়ন গুণ বলে অনুমান করা হয়। বহু ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করেও আরও বেশি ভরসম্পন্ন কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান না মেলায় গবেষকেরা মনে করছেন, এ ধরনের বস্তু ডার্ক ম্যাটারের বড় অংশ গঠন করতে পারে না।
মহাবিশ্বের শৈশবের আলোয় খোঁজা হয়েছে প্রমাণ
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের প্রাচীন আলোর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্ব যথেষ্ট ঠান্ডা হলে পরমাণু তৈরি হতে শুরু করে এবং আলো স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযোগ পায়। সেই সময়ের আলোর অবশিষ্টাংশ এখনো মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। একে বলা হয় ‘কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড’ বা সিএমবি।
এই প্রাচীন আলোর তাপমাত্রায় থাকা সূক্ষ্ম পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে পদার্থের বণ্টন সম্পর্কে ধারণা পান। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটারের বড় অংশ যদি অতি বিশাল কৃষ্ণগহ্বর দিয়ে গঠিত হতো, তাহলে ওই আলোর বৈশিষ্ট্যে তার প্রভাব দেখা যাওয়ার কথা।
কিন্তু পর্যবেক্ষণে এমন কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা ডার্ক ম্যাটারের বড় অংশজুড়ে অতি বিশাল কৃষ্ণগহ্বর থাকার ধারণাকে সমর্থন করে। ফলে এ ধরনের কৃষ্ণগহ্বরকে ডার্ক ম্যাটারের প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার সম্ভাবনা আরও সীমিত হয়েছে।
ছোট কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে এখনো অনুসন্ধান চলছে
তবে গবেষণার ফলাফল থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে অতি বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব নেই। বরং গবেষণাটি বলছে, এগুলো ডার্ক ম্যাটারের বড় অংশ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে, তুলনামূলক ছোট বা আদিম কৃষ্ণগহ্বর ডার্ক ম্যাটারের কিছু অংশ গঠন করতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। মহাবিশ্বের শুরুর দিকে তৈরি হয়ে থাকতে পারে এমন কৃষ্ণগহ্বরের বৈশিষ্ট্য ও মহাজাগতিক প্রভাব বুঝতে বিজ্ঞানীরা আরও তথ্য সংগ্রহ করছেন।
গবেষণাটি ২৬ অক্টোবর Physical Review Letters সাময়িকীতে প্রকাশের কথা রয়েছে।
সূত্র: স্পেস ডট কম (Space.com)


