...|...|...

বিশ্ব

ইরানে হামলার আলোচনায় মার্কিন পারমাণবিক বোমা B61-11, কতটা শক্তিশালী এটি?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, রাত ৯:২৫
Shares
ইরানে হামলার আলোচনায় মার্কিন পারমাণবিক বোমা B61-11, কতটা শক্তিশালী এটি?

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা B61-11। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে আলোচনার মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা B61-11। মাটির গভীরে প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটানোর বিশেষ সক্ষমতার কারণে বাঙ্কার ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষেত্রে এই বোমাকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সম্প্রতি মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেন, ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন অজ্ঞাত পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কার্লসনের এই দাবির সত্যতা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল- কোনো পক্ষই নিশ্চিত করেনি।

কার্লসনের যুক্তি, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের প্রায় ৩০০ ফুট গভীর গ্রানাইট স্তর প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে ভেদ করা সম্ভব নয়। তাই সেখানে হামলার ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রই একমাত্র বিকল্প হতে পারে। তবে ট্রাম্প গত ১৫ অক্টোবর নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছিলেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বোমার প্রসঙ্গও তোলেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন?

ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন, যার আরেক নাম কুহে কোলং গাজ লা। ইসরায়েলের ধারণা, ইরান সেখানে পারমাণবিক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে রেখেছে। তবে তেহরান ওই এলাকায় কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি এবং বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্থাপনাটির গভীরতা অন্তত ১০০ মিটার হতে পারে। ফলে প্রচলিত বোমা দিয়ে এর ভেতরের অবকাঠামো ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের GBU-57 বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমা দিয়েও পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বোমাটি প্রায় ১৮ মিটার কংক্রিট কিংবা ৬১ মিটার মাটি ভেদ করতে সক্ষম। তবে স্থাপনার প্রবেশপথ ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালালে সেটিকে অকার্যকর করা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কতটা শক্তিশালী B61-11?

B61-11 যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা B61 পরিবারের একটি বিশেষ সংস্করণ। ভূগর্ভস্থ শক্তিশালী স্থাপনা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে মার্কিন সামরিক বহরে যুক্ত হওয়া এই বোমাটি পুরোনো B53 বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমার বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়। ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এর ওজন প্রায় ১ হাজার ২১০ পাউন্ড।

নিউক্লিয়ার ওয়েপন আর্কাইভ ও বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, B61-11-এর বিস্ফোরণক্ষমতা ৩৪০ থেকে ৪০০ কিলোটন পর্যন্ত হতে পারে। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিসের এক হিসাব অনুযায়ী, ৩০০ কিলোটন ক্ষমতার একটি ভূগর্ভে প্রবেশকারী পারমাণবিক বোমা প্রায় ১৫০ মিটার গভীরের গ্রানাইট টানেল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শক্ত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের ক্ষেত্রে এর কার্যকর গভীরতা সর্বোচ্চ প্রায় ২০০ মিটার হতে পারে বলে ওই হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের আগে B61-11 সাধারণ মাটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ ফুট গভীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে আলাস্কার বরফযুক্ত মাটিতে পরীক্ষার সময় এটি ৬ থেকে ১০ ফুট গভীরে প্রবেশ করেছিল।

পরীক্ষা ও আধুনিক সংস্করণ

১৯৯৮ সালের ১৭ মার্চ আলাস্কায় একটি B-2 স্পিরিট বোমারু বিমান থেকে B61-11-এর দুটি পরীক্ষামূলক কেসিং ফেলা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একটি B-2 বিমান থেকে B61-11-এর পরীক্ষামূলক অ্যাসেম্বলি নিয়ে উড্ডয়ন পরীক্ষা চালায়। ২০১৩ সালে সান্ডিয়া ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজ রকেটের সাহায্যে একটি পরীক্ষামূলক ইউনিট কংক্রিটের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করায়।

তবে বোমাটির কার্যকর গভীরতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালে সাবেক মার্কিন বিমানবাহিনী প্রধান নরটন শোয়ার্টজ বলেছিলেন, এটি ১১০ থেকে ১৭০ মিটার গভীরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারে B61 পরিবারের একাধিক সংস্করণ রয়েছে। এর মধ্যে B61-12 এবং অপেক্ষাকৃত নতুন B61-13 উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের মে মাসে B61-13-এর প্রথম ইউনিট উৎপাদনের কাজ সম্পন্ন হয়।

এদিকে, গত ২১ জুলাই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটরদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পৃথিবীর যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে কী ধরনের অস্ত্র বা সামরিক সক্ষমতার কথা তিনি বলেছিলেন, তা বিস্তারিত জানাননি।