বাসাবাড়ি, কর্মক্ষেত্র, রান্নাঘর বা রাস্তাঘাট-যেকোনো জায়গায় মুহূর্তের অসাবধানতায় ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সঠিক পদক্ষেপ আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে পারে, আবার ভুল পদক্ষেপ বিপত্তি আরও বাড়াতে পারে। অনেকেই আবেগের বশে দ্রুত সাহায্য করতে এগিয়ে যান, কিন্তু মনে রাখবেন, আক্রান্ত ব্যক্তি যতক্ষণ বিদ্যুতের উৎসের সাথে যুক্ত থাকেন, তাকে স্পর্শ করলে আপনি নিজেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারেন।
তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর আগে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।
বৈদ্যুতিক শকের প্রথম মিনিটে করণীয়: পরিবেশ নিরাপদ করুন
১. স্পর্শ করবেন না: আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তখনও বৈদ্যুতিক তার বা যন্ত্রের সংস্পর্শে থাকেন, তবে ভুল করেও তাকে খালি হাতে বা ভেজা কিছু দিয়ে স্পর্শ করবেন না।
২. বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন: দ্রুততম সময়ে মেইন সুইচ, সার্কিট ব্রেকার বন্ধ করুন বা প্লাগ খুলে ফেলুন। নিশ্চিত হোন যে আপনার হাত শুকনো এবং আপনি পানির ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
৩. বিদ্যুৎ অপরিবাহী বস্তু ব্যবহার: যদি দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব না হয়, তবে শুকনো কাঠ, বাঁশ, প্লাস্টিক বা রাবারের মতো বিদ্যুৎ অপরিবাহী বস্তু ব্যবহার করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিদ্যুতের উৎস থেকে সরিয়ে দিন। অবশ্যই শুকনো জায়গায় দাঁড়িয়ে এই কাজটি করতে হবে।
৪. ছেঁড়া তার থেকে সাবধান: যদি রাস্তায় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়ে থাকে, তবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন এবং অন্যদেরও সতর্ক করুন। অবিলম্বে বিদ্যুৎ অফিস ও জরুরি সেবায় (যেমন ৯৯৯) কল করুন।
দ্বিতীয় মিনিটে করণীয়: আক্রান্তের অবস্থা পর্যবেক্ষণ
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা দ্রুত পরীক্ষা করুন:
সাড়া দিচ্ছেন কি না: তার কাঁধে আলতো চাপ দিন এবং জোরে ডাকুন।
শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা: ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে দেখুন তার বুকের ওঠানামা স্বাভাবিক আছে কি না।
৩ থেকে ৫ মিনিটে করণীয়: অবস্থার ভিত্তিতে পদক্ষেপ
আপনার পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিন:
- যদি শ্বাস-প্রশ্বাস না থাকে: ব্যক্তি যদি সাড়া না দেন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নেন, তবে কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে সিপিআর (CPR) শুরু করুন। বুকের ঠিক মাঝখানে হাতের তালুর নিচের অংশ রেখে জোরে এবং দ্রুত চাপ দিন (প্রতি মিনিটে ১০০-১২০ বার)। কাছাকাছি অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) থাকলে সেটি ব্যবহার করুন।
- যদি শ্বাস থাকে কিন্তু অচেতন: ব্যক্তি শ্বাস নিচ্ছেন কিন্তু সাড়া দিচ্ছেন না, এমন ক্ষেত্রে তাকে সাবধানে একপাশে কাত করে শুইয়ে দিন (রিকভারি পজিশন)। তবে ঘাড় বা পিঠে চোটের সন্দেহ থাকলে অকারণে নড়াচড়া করাবেন না।
- যদি সচেতন থাকেন: ব্যক্তি সচেতন থাকলে তাকে শান্তভাবে শুইয়ে দিন এবং হাঁটাচলা করতে দেবেন না।
বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার পর যা কখনোই করবেন না
- বিদ্যুৎ সংযোগ সচল থাকা অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি বা যন্ত্রের ওপর পানি ঢালবেন না।
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো খাবার বা পানীয় দেবেন না।
- কেউ পড়ে গেলে বা ছিটকে পড়লে মাথা, ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাত লাগার আশঙ্কা থাকে, তাই অকারণে নড়াচড়া করাবেন না।
- আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ বোধ করছেন জানালেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তাকে ছেড়ে দেবেন না।
দেখে সুস্থ মনে হলেও কেন হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন?
বৈদ্যুতিক শক হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করতে পারে (অ্যারিথমিয়া), যা দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেও প্রকাশ পেতে পারে। এ ছাড়া গভীর অভ্যন্তরীণ ক্ষত, পেশি ভেঙে কিডনির ক্ষতি, হাড় ভাঙা বা স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে।
তাই হাসপাতালে গিয়ে অন্তত একটি ইসিজি (ECG) করানো অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যদি জ্ঞান হারানো, শরীরের পোড়ার ক্ষত, বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা শরীরের কোনো অংশ অসাড় হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তবে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।


