প্রচলিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ার অনেক আগেই অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুতে থাকা ক্যানসারের সূক্ষ্ম লক্ষণ খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক এই এআই প্রযুক্তি রোগ নির্ণয়ের গড়ের চেয়ে প্রায় ৪৭৫ দিন আগেই ক্যানসারের পূর্বলক্ষণ শনাক্ত করতে পারে।
সাধারণত অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার বেশ দেরিতে ধরা পড়ে। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে যখন রোগ শনাক্ত হয়, ততক্ষণে ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা বেশ জটিল হয়ে দাঁড়ায়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পরিস্থিতি বদলানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
'রেডমড' (REDMOD) নামের এই রেডিওমিকসভিত্তিক আর্লি ডিটেকশন মডেলটি অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুর এমন সব সূক্ষ্ম পরিবর্তন খুঁজে বের করতে পারে, যা সাধারণত চিকিৎসকদের খালি চোখে ধরা পড়ে না। চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল 'গাট'-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সাহায্যে রোগীরা আরও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ পাবেন। তবে নিয়মিত চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের আগে এর কার্যকারিতা আরও ব্যাপকভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।
যেভাবে কাজ করে এই এআই প্রযুক্তি
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো অগ্ন্যাশয়ের ডাক্টাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা (PDAC)। প্রাথমিক পর্যায়ে টিস্যুতে এর পরিবর্তন এত সামান্য থাকে যে সাধারণ সিটি স্ক্যানেও তা ধরা কঠিন।
অন্যদিকে, 'রেডমড' সিটি স্ক্যানের ছবি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুর গঠনগত পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করে। এই পদ্ধতিকে রেডিওমিক্স বলা হয়। এছাড়া এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্ন্যাশয়কে আশেপাশের অন্যান্য অঙ্গ থেকে আলাদা করতে পারে, ফলে চিকিৎসকদের আলাদা করে অঙ্গটির সীমানা চিহ্নিত করার ঝামেলা পোহাতে হয় না।
রোগ ধরা পড়ার বহু আগেই সংকেত
প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করতে গবেষকরা ২১৯ জন রোগীর পুরোনো সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করেন। ওই স্ক্যানগুলোর সময় অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্টরা রোগীদের মধ্যে ক্যানসারের কোনো লক্ষণ দেখতে পাননি, অথচ পরবর্তীতে তাদের সবারই এই রোগ ধরা পড়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়
৮৭ জন রোগীর স্ক্যান করা হয়েছিল রোগ নির্ণয়ের ৩ থেকে ১২ মাস আগে।
৭৬ জনের স্ক্যান হয়েছিল ১২ থেকে ২৪ মাস আগে।
৫৬ জনের স্ক্যান হয়েছিল দুই বছরেরও বেশি সময় আগে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় তিন বছর আগে)।
গবেষকদের মতে, ক্যানসার অগ্ন্যাশয়ের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই যদি তা শনাক্ত করা যায়, তবে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
রেডিওলজিস্টদের তুলনায় এগিয়ে এআই
গবেষণায় ক্যানসার শনাক্তের ক্ষেত্রে রেডমডের কার্যকারিতা অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এতে দেখা যায়, এআই মডেলটির সংবেদনশীলতা ছিল ৭৩ শতাংশ, যেখানে রেডিওলজিস্টদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৩৯ শতাংশ।
বিশেষ করে রোগ নির্ণয়ের দুই বছরেরও বেশি সময় আগে করা স্ক্যানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবধানটি ছিল আরও স্পষ্ট। ওই সব ক্ষেত্রে রেডমডের শনাক্তকরণের হার ছিল ৬৮ শতাংশ এবং রেডিওলজিস্টদের ছিল ২৩ শতাংশ। এছাড়া ক্যানসার নেই এমন ব্যক্তিদের স্ক্যান শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও মডেলটি ৮১ থেকে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুল ফলাফল দিয়েছে। একই রোগীর কয়েক মাসের ব্যবধানে করা স্ক্যান বিশ্লেষণেও প্রায় ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল দেখিয়েছে এই এআই।
আরও গবেষণার প্রয়োজন
গবেষণার ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক হলেও, এখনই চিকিৎসাক্ষেত্রে সরাসরি রেডমড ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ওপর এর কার্যকারিতা যাচাই এবং বাস্তব চিকিৎসা পরিস্থিতিতে এর সুফল পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব মানুষের কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমছে কিংবা সম্প্রতি ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে, তাদের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এআই একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এটি সাধারণ মানুষের জন্য এখনই কোনো প্রতিষ্ঠিত স্ক্রিনিং পদ্ধতি নয় এবং এর মাধ্যমে রোগীর বেঁচে থাকার হার আসলেই বাড়ে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন।


