বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো পডকাস্ট, শ্রুতি নাটক বা অডিও বুক। হেডফোন কানে গুঁজে গল্পে হারিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা নতুন মনে হলেও এর ইতিহাস কিন্তু বেশ দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর। মঞ্চের দৃশ্যমান নাটককে শুধুমাত্র শব্দের ফ্রেমে বন্দি করে মানুষের ড্রয়িংরুমে, আর এখন পকেটে পৌঁছে দেওয়ার এই যাত্রার পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের প্রযুক্তিগত বিবর্তন।
শুরুর কথা: নাট্যফোনের যুগ (১৮৮০-এর দশক)
বেতার বা রেডিও আবিষ্কারের বহু আগেই অডিও নাটকের প্রাথমিক রূপ তৈরি হয়েছিল। ১৮৮১ সালে প্যারিসে ক্লিমেন্ট অ্যাডার 'টেলিফোনিক থিয়েটার' বা 'নাট্যফোন' (Théâtrophone) ব্যবস্থা চালু করেন। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা টেলিফোন লাইনের সাহায্যে থিয়েটার বা অপেরার পারফরম্যান্স ঘরে বসে লাইভ শুনতে পেতেন। এটিই ছিল দূর থেকে নাটক শোনার পৃথিবীর প্রথম প্রযুক্তিগত প্রচেষ্টা।
রেডিওর জন্ম ও প্রথম নাটক (১৯২০-এর দশক)
১৯২০-এর দশকে বাণিজ্যিক রেডিও সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর অডিও নাটকের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়। ১৯২২ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউজিওয়াই (WGY) স্টেশন থেকে রিচার্ড হিউজের লেখা 'আ কমেডি অব ডেঞ্জার' (A Comedy of Danger) নাটকটি প্রথম প্রচারিত হয়। নাটকটির পটভূমি ছিল একটি অন্ধকার কয়লা খনি, যা শব্দনির্ভর নাটকের জন্য ছিল একদম নিখুঁত। এরপর ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (BBC) তাদের নিজস্ব স্টুডিওতে তৈরি নাটক সম্প্রচার শুরু করে।
রেডিও নাটকের ‘স্বর্ণযুগ’ (১৯৩০ - ১৯৪০-এর দশক)
টেলিভিশন আবিষ্কারের আগে এই দুই দশকে রেডিওই ছিল মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। ১৯৩৮ সালে মার্কিন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অরসন ওয়েলসের একটি রেডিও নাটক ইতিহাস তৈরি করে। এইচ. জি. ওয়েলসের সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস অবলম্বনে 'ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস' নাটকটি তিনি এমন বাস্তবসম্মত নিউজ বুলেটিন আকারে পরিবেশন করেছিলেন যে, আমেরিকার বহু মানুষ সত্যি সত্যি ভিনগ্রহের প্রাণীদের (এলিয়েন) আক্রমণ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। এটি অডিও নাটকের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার এক ঐতিহাসিক প্রমাণ।
ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলার প্রেক্ষাপট
১৯২৭ সালে ভারতে রেডিও সম্প্রচার শুরুর পর কলকাতা বেতারে নাটক প্রচার শুরু হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বরা তাদের কণ্ঠের জাদুতে বেতার নাটককে জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯৩২ সালে প্রথম প্রচারিত 'মহিষাসুরমর্দিনী' আজও বাংলা অডিও-ধর্মী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় মাইলফলক।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতার নাটক প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে বিশাল জায়গা করে নেয়। 'সকাল-সন্ধ্যা' বা বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক নাটক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছিল।
শব্দ ও কণ্ঠের মেলবন্ধন
মঞ্চ নাটক যেখানে চোখের দেখাকে প্রাধান্য দেয়, অডিও নাটক সেখানে মানুষের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে। এর মূল হাতিয়ার দুটি:
শব্দ প্রভাব (Foley & Sound Effects): দরজার শব্দ, পায়ের আওয়াজ, ঝুম বৃষ্টি বা ঝড়ের আবহ তৈরি করে শ্রোতাকে অদৃশ্য এক দৃশ্যপটে নিয়ে যাওয়া হয়।
কণ্ঠের জাদু: অভিনেতাদের কণ্ঠের মড্যুলেশন ও আবেগের ওপরই পুরো নাটকের সাফল্য নির্ভর করে।
ডিজিটাল যুগে নতুন রূপ
টেলিভিশন এবং সিনেমার দাপটে মাঝে রেডিও নাটক কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও, একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের যুগে এটি আবার নতুন শক্তিতে ফিরে এসেছে। বর্তমানের পডকাস্ট কালচার, স্পোটিফাই, ইউটিউব বা স্টোরিটেলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর কল্যাণে অডিও ফিকশন এখন বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়। পাশাপাশি দুই বা ততোধিক শিল্পীর স্ক্রিপ্ট দেখে নাটকীয় সংলাপের মাধ্যম ‘শ্রুতি নাটক’ও আধুনিক বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম জনপ্রিয় ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রযুক্তি বদলে রেডিওর বড় বাক্স থেকে নাটক এখন মানুষের কানের ইয়ারফোনে চলে এসেছে সত্যি, তবে শব্দের মাধ্যমে গল্প শোনার ও শোনানোর এই চিরন্তন আবেদন আজও ফুরিয়ে যায়নি।


