যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখলে ইয়েমেন উপকূলের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতি সরকার। ইয়েমেনের বিদ্রোহী প্রশাসনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসেইন আল-এজ্জি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, সানা যদি এই জলপথ বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা খোলার সাধ্য দুনিয়ার কারও নেই।
কৌশলগত গুরুত্ব ও প্রণালীর অবস্থান
উত্তর-পূর্ব দিকে ইয়েমেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝে অবস্থিত বাব আল-মানদেব প্রণালী মূলত লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের (এবং এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগর) সাথে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২৯ কিলোমিটার বা ১৮ মাইল প্রশস্ত হওয়ায় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য মাত্র দুটি চ্যানেল ব্যবহারের সুযোগ থাকে। বর্তমানে এই জলপথটি কার্যত ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের ৫ শতাংশ (২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী দৈনিক প্রায় ৪১০ কোটি ব্যারেল) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সৌদির মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতে বাব আল-মানদেবের ওপর নির্ভরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরমুখী ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে রেকর্ড পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—উভয় প্রণালীই বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশই চিরতরে থমকে যাবে।
হুতিদের অবরোধের ক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাব
এর আগে গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজের জন্য এই পথ অবরুদ্ধ করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিল হুতি বিদ্রোহীরা। ফলে আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ওই রুটে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হুতিরা যদি পুরোদমে এই পথ বন্ধ করতে চায়, তবে তাদের কেবল যাতায়াতকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালাতে হবে। এমনটি ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে আসবে এক ‘দুঃস্বপ্নতুল্য’ বিপর্যয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্টন কলেজের প্রেসিডেন্ট ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেনডল সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়া মানে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অচল করে দেওয়া।
বিশ্ব বাণিজ্যে যে ধরনের প্রভাব পড়তে পারে:
জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: তেল সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হবে এবং পেট্রোল পাম্প থেকে শুরু করে কারখানার উৎপাদনে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পথ পরিবর্তন ও অতিরিক্ত খরচ: বিকল্প হিসেবে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বা ‘কেপ অব গুডহোপ’ ঘুরে যেতে হবে, যার ফলে ভ্রমণ সময় ১০ থেকে ১৫ দিন এবং জ্বালানি খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে।
মূল্যস্ফীতি ও সাপ্লাই চেইন ধস: দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এছাড়া ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ কৌশলের ওপর নির্ভরশীল গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্স শিল্প মারাত্মক সংকটে পড়বে।
আর্থিক ক্ষতি: মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য এই পথ বন্ধ থাকলেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিশাল আর্থিক ক্ষতি সাধিত হবে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত জলপথটি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। হুতিদের এই হুঁশিয়ারি কেবল আঞ্চলিক সংঘাতকেই তীব্র করছে না, বরং পুরো বিশ্বকে এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।


