...|...|...

বিশ্ব

প্রতিদিন ২৩ হিরোশিমা বোমার সমান তাপ ছড়াতে পারে কানাডার এআই ডেটা সেন্টার

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ নভেম্বর ২০২৬, রাত ১১:৫৫
Shares
প্রতিদিন ২৩ হিরোশিমা বোমার সমান তাপ ছড়াতে পারে কানাডার এআই ডেটা সেন্টার

ছবি: এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কানাডায় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে বিশাল এক ডেটা সেন্টার। তবে প্রকল্পটি চালু হলে সেখান থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তাপ নির্গত হতে পারে, তা হিরোশিমায় নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার শক্তির প্রায় ২৩ গুণের সমান। এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ডেভিস।

কানাডার আলবার্টা প্রদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রস্তাবিত ‘ওয়ান্ডার ভ্যালি’ নামের এই ডেটা সেন্টার প্রকল্পটির উদ্যোক্তা ও'লিয়ারি ডিজিটাল লিমিটেড। এতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ডেটা সেন্টারগুলোর একটি হতে পারে। প্রায় ৬৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ করেন রবার্ট ডেভিস। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্টার্জন লেক ক্রি নেশনের (এসএলসিএন) পক্ষে তিনি এ বিশ্লেষণ তৈরি করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে ডেটা সেন্টারটি থেকে ঘণ্টায় প্রায় ১৮ গিগাওয়াট তাপ নির্গত হতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় এই তাপীয় শক্তির পরিমাণ হিরোশিমায় ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার প্রায় ২৩টির সমান।

তবে এই তুলনার অর্থ এই নয় যে সেখানে প্রতিদিন বোমার মতো বিস্ফোরণ ঘটবে। বরং বিপুল পরিমাণ তাপীয় শক্তির মাত্রা বোঝাতেই পারমাণবিক বোমার সঙ্গে তুলনা করেছেন গবেষক। তার ভাষায়, এটি একটি প্রাথমিক হিসাব, যা প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য করা হয়েছে। চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ধারণে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত তথ্য ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

ডেভিসের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে না নিয়ে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় বিপুল তাপ অপচয় হবে। অন্যদিকে ডেটা সেন্টারের সার্ভার ও কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি চালানোর সময় ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রায় সবটাই শেষ পর্যন্ত তাপে রূপান্তরিত হবে। দুই উৎস মিলিয়েই বিপুল তাপের হিসাবটি করেছেন তিনি।

শুধু তাপ নয়, কার্বন নিঃসরণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন এই পদার্থবিজ্ঞানী। তার অনুমান, পূর্ণ সক্ষমতায় প্রকল্পটি বছরে প্রায় ৩ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করতে পারে। তার হিসাবে, এই পরিমাণ কানাডার মোট বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের ৪ শতাংশেরও বেশি।

প্রকল্পটি নিয়ে আপত্তি তুলেছে স্টার্জন লেক ক্রি নেশন। তাদের ঐতিহ্যগত ভূখণ্ডের মধ্যে প্রকল্পটির অবস্থান। তাদের সংরক্ষিত এলাকা থেকে প্রকল্পস্থলের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। গত সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটিকে প্রাদেশিক পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিচারিক পর্যালোচনার আবেদন করে জনগোষ্ঠীটি। প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব যাচাই এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যথাযথ পরামর্শের দাবি জানিয়েছে তারা।

ডেভিসের মতে, এত বড় প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব শুধু আলাদা আলাদা অনুমতিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা যথেষ্ট নয়। বর্জ্য তাপ আশপাশের বনাঞ্চল, বন্য প্রাণী ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার আশঙ্কা, প্রচলিত পরিবেশগত বিধিমালা এত বড় আকারের ডেটা সেন্টারের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়নি।

তবে আলবার্টা প্রাদেশিক সরকার প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক না করার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিবেশ ও সুরক্ষিত এলাকা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকল্পটিতে এমন বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যা আলবার্টায় কয়েক দশক ধরে প্রচলিত ও পরীক্ষিত। সে কারণে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক না হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় সব অনুমতি নিতে হবে। পাশাপাশি বায়ু, ভূমি ও পানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত কারিগরি মূল্যায়ন জমা দিতে হবে এবং প্রকল্পটি নিরাপদে নির্মাণ ও পরিচালনা করা সম্ভব- তা নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে ও'লিয়ারি ডিজিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পল পালানজিয়ান জানিয়েছেন, প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়াকে সম্মান করে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা ও যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণ কতটা পরিবেশবান্ধব হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, তাপ নির্গমন ও কার্বন নিঃসরণের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।