...|...|...

চট্টগ্রাম

চোখে চোখে রেখেও বাঁচাতে পারলেন না মেয়েকে

বান্ধবী ভালো নয়, তাই ৬ মাস মেয়েকে স্কুলে পাঠাননি তাজমিনের মা

কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৮ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৭
Shares
বান্ধবী ভালো নয়, তাই ৬ মাস মেয়েকে স্কুলে পাঠাননি তাজমিনের মা

নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মা। ছবি: সংগৃহীত

মেয়ের বান্ধবী ভালো নয়—এমন আশঙ্কা থেকে প্রায় ছয় মাস স্কুলে যেতে দেননি মা। মেয়েকে চোখে চোখে রাখতেন, খোঁজখবর নিতেন নিয়মিত। সর্বশেষ বিকাল ৪টার দিকে মেয়ের সাথে কথা বলেও জানতে চেয়েছিলেন বান্ধবীর নাম ও বাসার ঠিকানা। বলেছিলেন, ‘তোর বান্ধবীর নাম বল, বাসার ঠিকানা বল, বাসায় গিয়ে নিয়ে আসব।’ কিন্তু মায়ের সেই উদ্বেগ আর সতর্কতা কোনো কাজে এল না। কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হয়েছে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের লাশ।

তাজমিনের মায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে মেয়েকে নিয়ে তার উদ্বেগ, বান্ধবীর সাথে মেলামেশা নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং শেষ কথোপকথনের স্মৃতি। তবে যে বান্ধবীকে ঘিরে মায়ের উদ্বেগ ছিল, তার সাথে তাজমিনের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করছে পুলিশ।

বিকাল ৪টায় শেষ কথা, এরপর কী ঘটেছিল

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকাল ৪টার দিকে তাজমিনের সাথে মায়ের সর্বশেষ কথা হয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে মা মেয়ের বান্ধবীর নাম ও বাসার ঠিকানা জানতে চান। তাকে বাসায় ফিরিয়ে আনার কথাও বলেন। কিন্তু এরপর তাজমিনের সাথে কী ঘটেছিল, কীভাবে সে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকায় পৌঁছাল এবং কারা তার সাথে ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্ব নিয়ে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন মা। বান্ধবীকে ভালো মনে না হওয়ায় প্রায় ছয় মাস তাজমিনকে স্কুলে যেতে দেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। সেই মেয়ের এমন মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

ধানক্ষেতে লাশ, পাশে পরিত্যক্ত অটোরিকশা

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কাঁচিকাটা-হরিশ্চর পাকা সড়কের জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার মানুমুড়া সংলগ্ন স্থানে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। পরে সড়ক থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে ফসলি জমির আইলের পাশে এক কিশোরীর লাশ দেখতে পান। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল এবং মুখ মাটির দিকে চেপে রাখা অবস্থায় ছিল।

খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরে সিআইডি ও পিবিআইসহ পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। মরদেহের পাশে থাকা অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়।

অটোরিকশাচালক সুমন গ্রেফতার

তাজমিনকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামে তার ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার খালা শাশুড়ি, বোন ও বোনজামাইকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুমনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রাথমিক তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডে সুমন একাই জড়িত থাকতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে পুলিশ। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার সাথে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সুমন প্রায়ই রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। তার নিজস্ব বাড়ি নেই; তিনি শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নেশাগ্রস্ত।

গলায় গামছা, শ্বাসরোধে হত্যার প্রাথমিক ধারণা

কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ জানান, বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। তাজমিনের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধে হত্যার ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তদন্ত এখনো চলছে। গ্রেফতার সুমনকে কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। হত্যার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার সাথে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ তদন্ত করছে। শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তে

তাজমিনের মৃত্যুর আগে মায়ের সাথে শেষ কথোপকথন, বান্ধবীর সাথে মেলামেশা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ এবং অটোরিকশায় করে তার চলাচল—সবকিছুই ঘটনাটির প্রেক্ষাপট বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব তথ্যের মধ্যে কোনটির সাথে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, তা এখনো প্রমাণিত নয়।

মায়ের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাজমিনের এমন পরিণতি হলো, কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। পরিবার ও এলাকাবাসী অপেক্ষা করছেন প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দোষীদের বিচারের।