প্রকৃতির অনেক প্রাণীর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বিস্ময়কর সব কৌশল। এবার সমুদ্রের রহস্যময় প্রাণী অক্টোপাসের শরীরের নমনীয়তা ও চলাচলের ধরন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন প্রজন্মের রোবট তৈরির পরিকল্পনা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের লক্ষ্য, এমন রোবট তৈরি করা, যা খুব সরু ও দুর্গম জায়গা দিয়েও সহজে চলাচল করতে পারবে।
অক্টোপাসের বিশেষত্ব হলো, প্রাণীটি নিজের শরীরের আকৃতি পরিবর্তন করে অত্যন্ত সরু ফাঁক দিয়েও বেরিয়ে যেতে পারে। এর পেছনে রয়েছে শরীরের বিশেষ গঠন ও পেশির নিয়ন্ত্রণক্ষমতা। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়া আরও ভালোভাবে বুঝে ভবিষ্যতের উদ্ধারকাজে ব্যবহারযোগ্য নমনীয় রোবট তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।
যেভাবে সরু জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যায় অক্টোপাস
মানুষের মতো শক্ত কোনো কঙ্কাল নেই অক্টোপাসের। এর শরীর মূলত পেশিবহুল হাইড্রোস্ট্যাট নামের বিশেষ কাঠামো দিয়ে তৈরি। ফলে প্রাণীটি নিজের আটটি বাহু ইচ্ছামতো বাঁকাতে ও সংকুচিত করতে পারে। একই সাথে শরীরের মধ্যবর্তী অংশের আকৃতিও প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নিতে পারে।
শরীর সংকুচিত করে সরু ফাঁক দিয়ে যাওয়ার সময়ও অক্টোপাসের গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কার্যক্রম সচল থাকে। এমনকি এর রক্ত সঞ্চালনব্যবস্থাও এ ধরনের পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
পাথুরে উপকূলে বসবাসকারী অক্টোপাস সাধারণত শিকারির হাত থেকে বাঁচতে কিংবা পাথরের ফাটলে লুকিয়ে থাকা খাবার সংগ্রহ করতে এই দক্ষতা ব্যবহার করে। আশপাশের সরু ফাটল পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে তারা বাহুর স্পর্শানুভূতির ওপর নির্ভর করে।
সরু গর্ত পার হতে ব্যবহার করে দুই ধরনের কৌশল
সিঙ্গাপুর ও ইতালির গবেষকদের পর্যবেক্ষণে অক্টোপাসের সরু জায়গা পার হওয়ার দুটি ভিন্ন কৌশলের বিষয় উঠে এসেছে।
গর্তের মুখ যদি অক্টোপাসের দুই চোখের মধ্যবর্তী দূরত্বের তুলনায় বড় হয়, তাহলে প্রাণীটি সাধারণত তিন ধাপে সামনে এগোয়। প্রথমে একটি বাহু দিয়ে গর্তের ভেতরের অবস্থা যাচাই করে। এরপর কয়েকটি বাহু গর্তের মধ্যে প্রবেশ করায়। সবশেষে বাহুগুলোর সাহায্যে শরীর ও মাথাকে টেনে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে গর্তটি যদি চোখের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও সরু হয়, তাহলে অক্টোপাসকে আরও জটিল পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে মাথা ও মেন্টল বা শরীরের প্রধান অংশ প্রবেশ করানোর আগে বাকি বাহুগুলো আলাদাভাবে সরু পথ দিয়ে বের করে নেয়।
গবেষকদের মতে, পরিস্থিতি বুঝে কৌশল পরিবর্তনের এই ক্ষমতাই অক্টোপাসকে অত্যন্ত দক্ষ করে তুলেছে।
উদ্ধারকাজে কাজে লাগতে পারে অক্টোপাসের কৌশল
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, অক্টোপাসের শরীরের নমনীয়তা ও চলাচলের কৌশল অনুসরণ করে ভবিষ্যতে বিশেষ ধরনের রোবট তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে ভূমিকম্প, ভবনধস কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে পড়া মানুষকে খুঁজে বের করার কাজে এসব রোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে উদ্ধার অভিযানে ব্যবহৃত অনেক রোবট লম্বা ও সরু আকৃতির হয়ে থাকে। এর ফলে সেগুলো ছোট জায়গায় প্রবেশ করতে পারলেও একসঙ্গে বেশি যন্ত্রপাতি বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অক্টোপাসের আদলে তৈরি নমনীয় রোবটে একাধিক বাহু যুক্ত করা সম্ভব হলে সেখানে ক্যামেরা, বিভিন্ন সেন্সর, যোগাযোগের যন্ত্র এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহন করা যাবে। একই সঙ্গে সরু ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করে দুর্গম স্থানে অনুসন্ধান চালানোও সহজ হতে পারে।
রোবট তৈরিতে বড় চ্যালেঞ্জ
অক্টোপাসের মতো নমনীয় রোবট তৈরি করা অবশ্য সহজ কাজ নয়। প্রকৌশলীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রোবটের বাহুগুলোকে একই সাথে নমনীয় ও শক্তিশালী করে তোলা।
কারণ, সরু জায়গায় প্রবেশের জন্য বাহুগুলোকে সহজে বাঁকানো ও সংকুচিত করা প্রয়োজন। আবার পুরো শরীরকে সামনে টেনে নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহনের জন্য যথেষ্ট শক্তিও থাকতে হবে।
বিজ্ঞানীদের আশা, অক্টোপাসের চলাচল ও শরীরের গঠন নিয়ে গবেষণা ভবিষ্যতে রোবট প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় মানুষের পক্ষে পৌঁছানো কঠিন, সেখানে এসব নমনীয় রোবট অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সহায়ক হতে পারে।


