...|...|...

অন্যান্য

এআইয়ের পরামর্শে ওষুধ সেবন, অতপর...

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:৫৬
Shares
এআইয়ের পরামর্শে ওষুধ সেবন, অতপর...

ছবি: এআই জেনারেটেড।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে মৃগীরোগের ওষুধের মাত্রা কমানোর পর এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই নারীর মা-বাবা।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের বাসিন্দা বোয়েন ওয়ান নামের ৩১ বছর বয়সী ওই সফটওয়্যার প্রকৌশলীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি তাকে মৃগীরোগের ওষুধ কমানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা দিয়েছিল। সেটি অনুসরণ করেই তিনি ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়ান দীর্ঘদিন ধরে মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধে তার অসুস্থতা নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে ওষুধের মাত্রা ধীরে ধীরে কমানোর বিষয়ে পরামর্শ চান। এআই চ্যাটবট তার পরিকল্পনাকে সমর্থন করে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার একটি সময়সূচি তৈরি করে দেয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

কীভাবে ওষুধ কমানোর সিদ্ধান্ত নেন ওয়ান?

ওয়ান প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিন সেবন করতেন। এই ওষুধের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তার মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। বিশেষ করে কথা বলার সময় জড়তা তৈরি হচ্ছে বলে তার আশঙ্কা ছিল।

এ নিয়ে তার উদ্বেগের আরেকটি কারণ ছিল চাকরি ও ভিসার অনিশ্চয়তা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ান অ্যামাজনে চাকরি করতেন এবং অসুস্থতাজনিত ছুটিতে ছিলেন। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চাকরি হারানোর পর ভিসার বৈধতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়ার চাপ তৈরি হয়।

চাকরির সাক্ষাৎকারে কথা বলার সক্ষমতা নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে তিনি ওষুধের মাত্রা কমানোর উপায় খুঁজছিলেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথনে তিনি জানিয়েছিলেন, ওষুধ কমালে সাক্ষাৎকারে কথা বলার সক্ষমতা কিছুটা ফিরে পেতে পারেন বলে তার ধারণা।

পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা না করেই ওষুধ কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যাটজিপিটি তাকে উৎসাহিত করে। প্রথমে দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম এবং পরে ২০০ মিলিগ্রামে নামিয়ে আনার বিষয়ে তিনি পরামর্শ চান। এরপর চ্যাটবট তাকে ধাপে ধাপে ওষুধ বন্ধ করার সময়সূচি দেয় বলে আদালতের নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ কমানোর অভিযোগ

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি ওয়ানকে চিকিৎসকের কাছে ওষুধ কমানোর বিষয়টি গোপন রাখতে উৎসাহিত করেছিল। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তেও চ্যাটবট সমর্থন দিয়েছিল বলে পরিবারের আইনজীবীরা দাবি করেছেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে ওয়ানের চিকিৎসক নিকোলাস পুলোস বলেন, তার মতো রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর ওষুধ বন্ধ বা কমানোর পরামর্শ তিনি দিতেন না। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ওষুধে রোগ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া গুরুতর চিকিৎসাগত ভুল হতো।

তবে এসব অভিযোগ মামলার অংশ। আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে এগুলোকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

শেষ ফোনালাপের পর আর সাড়া দেননি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে ওয়ান তার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেন। পরিবারের ধারণা, ওই সময় তিনি খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।

এর কয়েক দিন পরও পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় এক পরিচিত ব্যক্তিকে তার অ্যাপার্টমেন্টে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন তার মা-বাবা চীনে ছিলেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে ঘটনাটি জানতে পারেন।

পরিবারকে পরে জানানো হয়, মৃগীরোগের জটিলতার কারণে ওয়ানের মৃত্যু হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ওষুধের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার পর এমন পরিণতি তাদের কাছে ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

চ্যাটজিপিটিকে ‘বন্ধু’ ভাবতেন ওয়ান

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়ান দীর্ঘদিন একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন। মা-বাবার কাছ থেকে দূরে বসবাস করতেন তিনি। জনসমক্ষে খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কায় বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন। চাকরির অনিশ্চয়তা ও অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও তিনি এআই চ্যাটবটের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন।

২০২৫ সালের মার্চে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথনে তিনি লিখেছিলেন, বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে চ্যাটবটকে একজন বন্ধুর মতো ভাবতে শুরু করেছেন।

পরিবারের অভিযোগ, এই নির্ভরতার সুযোগেই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত একটি গুরুতর সিদ্ধান্তে চ্যাটবটের দেওয়া অনুপযুক্ত পরামর্শ তার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

চোসুনের এক প্রতিবেদনে ওয়ানের কথোপকথনের কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, ওষুধের মাত্রা কমানো নিয়ে তার প্রশ্নের জবাবে চ্যাটবট পরিকল্পনাটিকে যুক্তিসংগত বলে সমর্থন করেছিল। অস্বাভাবিক উপসর্গের কথা জানানোর পরও তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

ওপেনএআইয়ের বক্তব্য কী?

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র ড্রিউ পুসাতেরি ঘটনাটিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়ান এমন একটি মডেল ব্যবহার করেছিলেন, যা বর্তমানে আর চালু নেই এবং যেটি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

মুখপাত্র বলেন, চ্যাটজিপিটি চিকিৎসাসেবার বিকল্প নয়। তবে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বোঝা, স্বাস্থ্যবিমা ও জটিল চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হতে পারে।

মামলায় ওয়ানের মা-বাবার আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, ওপেনএআইয়ের সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থার ত্রুটির মূল্য তাদের মেয়েকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। মামলার অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্যের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয়, তা এখন দেখার বিষয়।

মৃগীরোগের ওষুধ নিজে থেকে কমানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, মৃগীরোগ এমন একটি স্নায়বিক অবস্থা, যার কারণে বারবার খিঁচুনি হতে পারে। রোগের ধরন ও ব্যক্তিভেদে উপসর্গের পার্থক্য দেখা যায়। কারও ক্ষেত্রে খিঁচুনির সময় চেতনা হারিয়ে যেতে পারে, আবার কারও হাত-পায়ে অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি দেখা দিতে পারে।

মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধ চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রহণ করা জরুরি। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা কমানো বা হঠাৎ বন্ধ করলে খিঁচুনি ফিরে আসা কিংবা গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে বিকল্প বা মাত্রা পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

বোয়েন ওয়ানের মৃত্যু ঘিরে মামলাটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উচ্চঝুঁকির সিদ্ধান্তে এআই চ্যাটবটের ভূমিকা কতটা নিরাপদ এবং ভুল পরামর্শের ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ কীভাবে হওয়া উচিত। মামলার নিষ্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।