শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার জন্য একটি বড় উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৫ বছরের কম বয়সিদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ছাড়া সামাজিক মাধ্যম, নির্দিষ্ট গেমিং প্ল্যাটফর্ম এবং এআই চ্যাটবট ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক ভাষণে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন ঘোষণা দেন, ১৩ বছরের নিচে কোনো সামাজিক মাধ্যম নয়। ১৫ বছরের নিচে কোনো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা ইউরোপের রয়েছে। নিয়মরীতি আমরাই ঠিক করব, বিগ টেক কোম্পানিগুলো নয়।
বেশ কিছু ইইউ সদস্য দেশের রাজনৈতিক চাপের মুখে বৃহস্পতিবার ‘কিডস অ্যাক্ট’-এর আওতায় এই ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করবে। ফ্রান্স ও গ্রিসের মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের সামাজিক মাধ্যমের নাগাল সীমিত করতে ব্রাসেলসের ওপর চাপ দিয়ে আসছে।
ইইউর সামনে থাকা বিভিন্ন হুমকি তুলে ধরে দেওয়া এক সুদূরপ্রসারী ভাষণে ভন ডার লিয়েন এআইকে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি ‘আমাদের সময়ের দ্বিতীয় বড় মোড় পরিবর্তনকারী বিন্দু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করা গেলেই কেবল মানবজাতি ‘এআইয়ের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে’ পারবে। তিনি বলেন, তৈরি হওয়া এআই মডেলগুলো এমন মাত্রায় হ্যাকিংয়ের সুযোগ করে দেবে যা আমরা কখনও কল্পনাও করিনি। আর খুব দ্রুতই এগুলো এমন সব প্রতিপক্ষের হাতে চলে যাবে যারা আমাদের চেয়ে বিশ্বকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখে।
এ সময় তিনি মডেল মূল্যায়ন, যাচাইকরণ, আর্লি ওয়ার্নিং বা প্রাথমিক সতর্কতা এবং এআই নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর সাথে ‘একযোগে কাজ করার’ প্রস্তাব দেন।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)-এর দেখা সামাজিক মাধ্যম বিষয়ক খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা কেবল অভিভাবকদের তত্ত্বাবধানেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবে। আর ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সীরা শুধুমাত্র অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণ এবং সময়সীমার মতো নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে। ভন ডার লিয়েন তার ভাষণে বলেন, শিশুরা যাতে আরও বেশি চরমপন্থী কনটেন্টের দিকে ধাবিত না হয়, তা আমাদের মেনে নিতে বাধ্য নয়।
মেয়েদের ছবি ব্যবহার করে এআই-জেনারেটেড বা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি যৌনতাপূর্ণ ছবি তৈরি করা হোক, তাও আমরা মেনে নেব না। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা প্রমাণের ভার উল্টে দিচ্ছি। প্ল্যাটফর্মগুলোকে এখন আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা নিরাপদ। কারণ বিষয়টি অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক মাধ্যমে প্রবেশাধিকারের নয়, বরং আমরা কখন এবং কীভাবে সামাজিক মাধ্যমকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নাগালের মধ্যে আসতে দিচ্ছি, সেটাই আসল কথা।
ফাইল শেয়ারিং ও কপিরাইট পলিসির বিষয়ে নিবন্ধটিতে জানানো হয়েছে যে, এফটি ডট কম -এর নিয়ম অনুযায়ী এই নিবন্ধটি কপি করে অন্যদের সাথে শেয়ার করা কপিরাইট নীতির লঙ্ঘন।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কড়া নজরদারি ও জরিমানা শিশু নির্যাতন ও আসক্তি সৃষ্টিকারী আচরণ রোধে সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন গেমিং সেবা এবং এআই চ্যাটবটগুলোকে অবশ্যই নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সেফগার্ড চালু করতে হবে। এআই কমপ্যানিয়ন ও চ্যাটবট সেবাগুলোকে এমন নকশা তৈরি থেকে বিরত থাকতে হবে যা শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর আবেগীয় নির্ভরতা তৈরি করে কিংবা তাদের ক্ষতিকর আলোচনার মুখে ফেলে। অফিশিয়াল ভেরিফিকেশন অ্যাপ ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের বয়স নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে এসব কোম্পানি। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এই নিয়ম অমান্য করলে কোম্পানিগুলোকে তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক আলের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে অবৈধ ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য ইতোমধ্যে ইইউর ডিজিটাল সার্ভিস অ্যাক্ট এবং এআই অ্যাক্ট কার্যকর রয়েছে, যার সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর এই নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো যুক্ত হবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রাসেলসের বিরুদ্ধে আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগ তুলেছেন এবং এ ধরনের পদক্ষেপের জবাবে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে কমিশনের কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো, আসক্তিমূলক ডিজাইন, দুর্বল বয়স যাচাই এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ এখন কেবল ইউরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা মেটার সাম্প্রতিক উদাহরণ টেনে বলেন, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে—এমন অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের সাথে কোম্পানিটির সম্প্রতি সমঝোতা হয়েছে।


