ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী আল-মোখার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে কৌশলগত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এর ফলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালী ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সামরিক সূত্রগুলোর দাবি, প্রণালীটির আশপাশে হুথিদের সামরিক প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। তারা হানিস দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলেও জানা গেছে। প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ধুবাব শহর এবং এর বিপরীতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মান্দেবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বা শক্তিশালী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের পৃষ্ঠপোষক ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সংঘাতে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। কারণ, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতার মধ্যেই বাব আল-মান্দেব নিয়ে নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। জলপথটিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতোমধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে হলে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়বে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন মিত্র জোট বর্তমানে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে ধুবাবের দিকে সরে যাচ্ছে বলে সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের জন্য নতুন চাপ
বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ নিয়ে চাপের পাশাপাশি জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির অবনতি হলে রাজনৈতিকভাবেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় যুদ্ধের প্রভাব মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘের সতর্কতা
ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির সংঘাত নতুন এবং আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
মোখা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় তারা বাব আল-মান্দেবের প্রবেশপথের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি চলমান উত্তেজনাকে অগ্রহণযোগ্য বলেও মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বা অবরোধ দিয়ে ইয়েমেন সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তারা আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের নির্দেশনার অভিযোগ
ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা ছিল।
তবে হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ডে ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তেহরান অস্বীকার করে আসছে।
হুথি মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম তাদের অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইয়েমেনে সৌদি হামলা বন্ধ হলে হুথিদের অভিযানও বন্ধ হয়ে যাবে।
এদিকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য নৌযানগুলোর জন্য লোহিত সাগরে চলাচল নিরাপদ রয়েছে।
বাড়ছে জ্বালানি বাজারের উদ্বেগ
বাব আল-মান্দেব দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
জ্বালানি মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দামও প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতার মধ্যে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।
ইরানের ওপর সৌদি চাপ
হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানের প্রতি সৌদি আরবের বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীর পর বাব আল-মান্দেব ঘিরে অস্থিতিশীলতা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


