মাঠজুড়ে সোনালি আঁশের সমারোহ। কোথাও পাট কাটা হচ্ছে, কোথাও আঁটি বেঁধে জাগ দেওয়া হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতে এবার ফরিদপুরে পাটের ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি উন্নত হয়েছে আঁশের রং ও গুণগত মান। ভালো ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেও সেই হাসি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে পাটের বাজারদরের ওপর। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় এখনো দুশ্চিন্তায় জেলার হাজারো পাটচাষি।
দেশের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষকের প্রত্যাশা ছিল-ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দামও পাবেন। কিন্তু সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমি প্রস্তুত, পাট কাটা, পরিবহন ও জাগ দেওয়াসহ উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে প্রায় ৮৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭২ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ করেছেন কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে এ পাটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জেলার কানাইপুর, নালেরমোড়, তালমা, কাদিরদী, সাতৈর, বড়গাসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের পাটে তুলনামূলক ভালো দাম মিললেও কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের তুলনায় এ দাম খুব বেশি নয়।
সালথা উপজেলার পাটচাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, মাঠে পাট ভালো হয়েছে, আঁশও ভালো হয়েছে। কিন্তু এই পাট ফলাতে আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে। সার-বীজ থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি-সবকিছুর দাম বেড়েছে। এখন যদি পাটের দাম কমে যায়, তাহলে এত পরিশ্রম করেও লাভ থাকবে না।
আরেক চাষি নাছির হোসেন বলেন, পাট চাষ শুধু একজন কৃষকের পরিশ্রম নয়, এর সাথে পুরো পরিবারের আশা-ভরসা জড়িয়ে থাকে। জমিতে ফসল ভালো হলে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, সংসারের খরচ কিংবা পুরোনো ঋণ পরিশোধের স্বপ্ন দেখেন কৃষক। কিন্তু বাজারে দাম না থাকলে সেই স্বপ্নই দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়।
কৃষকেরা জানান, কয়েক মাস ধরে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা পাটের পরিচর্যা করেছেন। পাট কাটার পর পানিতে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানো-প্রতিটি কাজেই শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বাজারে পাট বিক্রি করে ন্যায্য দাম না পেলে তাদের সেই পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য থাকে না।
তবে বেশিরভাগ কৃষকের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে পাটের দাম ভালো থাকলেও পরবর্তীতে বাজারে দরপতন হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। অনেক কৃষক সংসারের প্রয়োজন মেটাতে বা ঋণ পরিশোধের জন্য পাট সংরক্ষণ না করে কম দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও কৃষকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত হয় না-এমন অভিযোগও রয়েছে চাষিদের।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শাহদুজ্জামান বলেন, এবারের মৌসুমে পাট উৎপাদনের জন্য আবহাওয়া যথেষ্ট অনুকূল ছিল। বিশেষ করে পাট জাগ দেওয়ার সময় খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকায় আঁশের রং ও গুণগত মান ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
কৃষকেরা বলছেন, ভালো ফলন তখনই স্বস্তির কারণ হবে, যখন উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে তাদের হাতে ন্যায্য লাভ থাকবে। তাই পাটের বাজার স্থিতিশীল রাখা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং প্রয়োজন হলে সরকারি উদ্যোগে পাট কেনার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের মতে, কৃষকের ঘাম ও শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা গেলে শুধু তাদের পরিবারই উপকৃত হবে না, পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে আরও অনেকের। আর কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলেই ফরিদপুরের সোনালি আঁশ সত্যিকার অর্থে সোনালি ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।



