...|...|...

ঢাকা

গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শিল্প-পরিবহণে বিপর্যয়, বন্ধ তিন শতাধিক কারখানা

তন্ময় সাহা, নরসিংদী
প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:৩৫ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৪:৩৬
Shares
গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শিল্প-পরিবহণে বিপর্যয়, বন্ধ তিন শতাধিক কারখানা

গ্যাসের ঘাটতির কারণে নরসিংদীর শিল্প ও পরিবহণ খাতে নেমে এসেছে বিপর্যয়। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় গত দুই সপ্তাহ ধরে জেলার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন শিল্পমালিকেরা। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষ।

দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নরসিংদীর মাধবদী, চৌয়ালা, শেখেরচরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ডাইং, ফিনিশিং, প্রিন্টিং, টেক্সটাইল, নিটিং, উইভিং, স্পিনিং ও প্রসেসিংসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় শিল্পকারখানা। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় এসব কারখানার দামি যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।

শিল্পমালিকদের দাবি, গ্যাসনির্ভর ছোট ছোট কারখানা চালাতে যেখানে প্রায় ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক এলাকায় শূন্য থেকে ৩ পিএসআই পর্যন্ত চাপ পাওয়া যাচ্ছে। আর বড় বড় ডাইং মিলে ৫০ পিএসআই গ্যাসের চাপ পাওয়ার কথা, সেখানে বর্তমানে প্রায় ২০ পিএসআই চাপের নিচে পাওয়া যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়িক লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মঘণ্টা ও শিফট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আয় কমে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক।

শিল্পমালিকদের হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে জেলার প্রায় তিন শতাধিক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন আরও কমে গিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

স্টার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস) জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তারা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে অনেক গ্রাহক ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন। কেউ কেউ স্বজনপ্রীতির অভিযোগও করছেন।

সিএনজি চালক রফিক মিয়া বলেন, নিয়মিত গ্যাস না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। যাত্রীর চাপ বেশি, কিন্তু গ্যাস সরবরাহ কম। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আয়ও কমে যাচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সংকট সমাধানের দাবি জানান তিনি।

নরসিংদী শিক্ষা চত্বরের এক সবজি বিক্রেতা বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে তার বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক মেসে রান্না হচ্ছে না। অনেক শিক্ষার্থী মেস ছেড়ে বাড়িতে চলে গেছেন। ফলে বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে।

চৌয়ালার একটি ডাইং কারখানার মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, গ্যাস না থাকায় তাদের উৎপাদন কমে গেছে। শ্রমিকেরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না, আবার তাদের নিয়মিত বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

চৌয়ালার একজন সাগর নামের একজন শ্রমিক জানান, গ্যাস না থাকার কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। পরে ঠিকমতো ঘরে বাজার করতে পারছি না। আমার পরিবারে আমি একাই রোজগার করি। এভাবে চলতে থাকলে আমি বউ বাচ্চা এবং বাবা মাকে খাওয়াব কি?

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এক বাসচালক রফিক মিয়া বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে গাড়ি স্বাভাবিকভাবে চালাতে পারছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিএনজি স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়াও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মেসে থাকা শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, গ্যাস না থাকায় মেসে রান্না হচ্ছে না। বাইরে খেতে গেলে প্রতিদিন ৩০০ টাকার বেশি খরচ হয়। শিক্ষার্থীদের অনেকেরই এ ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই। কলেজ খোলার সময় সামনে রেখে গ্যাস সংকটে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আব্দুল মোমেন মোল্লা বলেন, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না থাকায় শিল্পকারখানাগুলো কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

বিটিএমএর মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি।

শিল্পের পাশাপাশি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহণ খাতেও। জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবহণ ব্যয়।

নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, এভাবে সংকট চলতে থাকলে শিল্পমালিকেরা শ্রমিকদের বেতন কিংবা গ্যাস বিল কোনোটিই ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে আমাদের পাশাপাশি শ্রমিকরা ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা বড় লোকসানের সম্মুখীন হবো।

গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, সরকারকে জানাতে হবে এই সংকট কবে নাগাদ নিরসন হবে এবং ততদিন পর্যন্ত শিল্পমালিকদের কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

নরসিংদীর আবেদ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ২০ দিন ধরে তাদের কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। তবে শ্রমিকদের অসন্তোষ এড়াতে তাদের দিয়ে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হচ্ছে। তবে গ্যাস না পেলে এভাবে কতদিন চালোনো যাবে,এ নিয়ে মন্তব্য করেন।

শিল্প ও পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শিল্প খাতে প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মানুষ এবং পরিবহণ খাতে আরও প্রায় ৩ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন।

তাদের দাবি, দ্রুত গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। অন্যথায় সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা যায়, নরসিংদীতে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৩৬৫টি গ্যাস সংযোগ, আবাসিক খাতে প্রায় ২৭ হাজার গ্রাহক এবং ১৯টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। শিল্প ও পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে এসব খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

তিতাস গ্যাসের ঘোড়াশাল জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান বলেন, নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। যেটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তার পুরোটাই ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাসের চাপ না বাড়লে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা প্রয়োজনের ভিত্তিতে আমরা আমরা গ্যাস সরবরাহ করছি।