কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে যশোরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বেলা ১১টায় যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের জানাজা শেষে দাদার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন তার মা-বাবা। এদিকে, তাজমিনের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাজমিনের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। শুক্রবারও শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা বাড়িতে ভিড় করেন।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সাথে কুমিল্লা শহরে থাকত সে। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত তাজমিন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার ভাষ্য, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা জানায়।
আবদুল আলীম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের ফোন থেকে একটি মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠানো হয়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তবে তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকায় মেসেজটি দেখতে পারেননি। সকালে মেসেজ দেখে লোকেশনে গিয়ে মেয়ের লাশ উদ্ধারের দৃশ্য দেখতে পান।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, মেয়ের সাথে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বিকেলে তার কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন এক বান্ধবীর বাড়িতে থাকার কথা জানিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলেছিল। বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও মেয়ে কিছু জানায়নি বলে দাবি করেন তিনি। মেয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন কেয়া খাতুন।
মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় আপাতত কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করতে চান না আবদুল আলীম। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই।’ একই সাথে ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, তাজমিন তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিল। পড়াশোনায় মেধাবী তাজমিন বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সাথে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তার এমন মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তারা এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ রাখছিল তাজমিন। একপর্যায়ে সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর কীভাবে সে লালমাইয়ের ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ওই কিশোরী যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত করে থাকতে পারে, সেটির বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় স্কুলছাত্রীকে বহনকারী সুমন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালককে আটক করা হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণ বাঁচাতে সে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে সুমন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে আটক করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি ও ঘটনার বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলনের কথা জানিয়েছে পুলিশ।


