ছয় ছেলে, তবু শেষ বয়সে তাদের কারও ঘরে আশ্রয় হলো না ৮৫ বছরের বৃদ্ধা জয়নব ভানুর। দীর্ঘ এক মাস হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে ছেলেদের ঘরে জায়গা না পেয়ে বসে থাকলেন দরজার সামনে। অসহায় মায়ের চোখের জল আর বুকভরা কষ্টের কথা শুনে এগিয়ে এলেন স্থানীয় কয়েকজন যুবক। শেষ পর্যন্ত মেয়ে ঝর্ণা বেগম এসে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনা চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমেদের বাড়িতে ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অসুস্থ হয়ে জয়নব ভানু প্রায় এক মাস কুমিল্লায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসা শেষে স্বামীর ভিটায় ফিরে এসে ছেলেদের ঘরে আশ্রয় খুঁজছিলেন তিনি। কিন্তু কোথাও ঠাঁই না পেয়ে বাড়ির দরজার সামনেই বসে থাকেন। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া না পেয়ে সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকেন বৃদ্ধা।
এ সময় কয়েকজন স্থানীয় যুবক তাকে দেখতে পেয়ে কাছে যান এবং খোঁজখবর নেন। তাদের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জয়নব। স্বামীর ভিটায় অন্তত একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি, যাতে জীবনের শেষ দিনগুলো নিজের পরিচিত জায়গায় কাটাতে পারেন।
জয়নবের মেজো ছেলে আবুল কাশেম জানান, তার মা দীর্ঘ এক বছর কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তবে কয়েকবার তাকে ডেকেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী জানান, বৃদ্ধা তাদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তার জানা নেই। সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও জানান, জয়নব ভানু কোথায় ছিলেন বা কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
তবে মায়ের এমন অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে ছুটে যান মেয়ে ঝর্ণা বেগম। তিনি জানান, ভাইদের ঘরের সামনে মায়ের বসে থাকার খবর শুনেই সেখানে যান। তার অভিযোগ, প্রায় ২০ বছর ধরে ভাইয়েরা মায়ের সাথে এমন আচরণ করছেন। তারা চান, মা যেন তার কাছেই থাকেন।
জয়নবের ছয় ছেলের মধ্যে শাহজাহান ও আবুল কাশেম নিজ বাড়িতে থাকেন। বাকি চার ছেলে প্রবাসে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের খান। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী বসে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।
চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল জানান, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে আগে অবগত ছিলেন না। তবে একজন বৃদ্ধ মায়ের সাথে এমন ঘটনা সত্যি হৃদয়বিদারক। এ ঘটনায় ছেলেদের বিচার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ছয় ছেলের কারও ঘরে আশ্রয় না পেয়ে মেয়ের হাত ধরেই বাড়ি ছাড়তে হয় ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানুকে। যে বাড়িতে স্বামীর স্মৃতি আর জীবনের দীর্ঘ সময় জড়িয়ে আছে, সেই বাড়ির দরজায় বসে কাঁদতে থাকা মাকে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় দিলেন তার মেয়ে ঝর্ণা বেগম।


