...|...|...

সারাদেশ

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড

স্বামী-স্ত্রী বলা হলেও সুইটিকে নিয়ে ভিন্ন দাবি নজরুলের বাবার

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ভোর রাত ৪:১৫
Shares
স্বামী-স্ত্রী বলা হলেও সুইটিকে নিয়ে ভিন্ন দাবি নজরুলের বাবার

স্বামী-স্ত্রী বলা হলেও সুইটিকে নিয়ে ভিন্ন দাবি নজরুলের বাবার। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি তরুণ নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন নজরুলের বাবা আবদুল বাছির। তার বক্তব্য, সুইটি আক্তারকে তারা চেনেন না এবং ওই তরুণীর সাথে তার ছেলের বিয়ে হয়নি।

এদিকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর শোকে ভেঙে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের পরিবারটি। ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে বোনের মৃত্যু এবং বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ঋণের বোঝাসব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন নজরুলের বাবা-মা। তারা এখন ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছেন।

আবদুল বাছির জানান, কলেজে পড়ার সময়ই পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তার প্রশ্ন, নজরুল বিয়ে করলে তারা তা জানতেন না কেন? সুইটি আক্তারকে তারা চেনেন না বলেও জানান তিনি। তবে শুনেছেন, নজরুল ও সুইটি একই জায়গায় কাজ করতেন।

পরিবারের দাবি, গত ১৪ অক্টোবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে তারা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন। এর আগে এ বিষয়ে তাদের কিছু জানানো হয়নি। ছেলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, বিচার চলাকালে তিনি আইনগত সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন তারা।

নজরুল ইসলাম আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। এ জন্য সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তার বাবা। সে সময় নজরুলের বয়স ছিল ২০ বছর।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে নজরুল জানান, তিনি বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেননি স্বজনেরা।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সাথে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর ১৪ অক্টোবর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে গণমাধ্যমের খবর থেকে জানতে পারে পরিবার।

নজরুলের মৃত্যুর খবর শোনার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তার ফুফু আবেদা বেগম। ওই রাতেই তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

ছেলে ও বোনকে হারিয়ে শোকাহত আবদুল বাছির এখন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। পরিবারের বড় সন্তানকে বিদেশে পাঠাতে যে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন, তা কীভাবে পরিশোধ করবেন, সেই চিন্তাও তাকে তাড়া করছে।

আবদুল বাছির জানান, ছেলে ও বোন দুজনকেই হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নেওয়া ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা বুঝতে পারছেন না। সরকারের কাছে তার আবেদন, দ্রুত যেন ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

সৌদি আরবে কারাবন্দি থাকার সময় নজরুল যথাযথ আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার বাবা। আবদুল বাছিরের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় নজরুল তাকে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তার সাথে যোগাযোগ করেননি।

তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল কনস্যুলারের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা তার জন্য আইনগত সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পরিবারের কাছে নেই।

স্বজনদের অভিযোগ, নজরুলের গ্রেফতার থেকে শুরু করে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি তাদের আগে জানানো হয়নি। এখন তারা পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানতে এবং ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহায়তা চাইছেন।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানিয়েছেন, নজরুলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। লাশ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।

নজরুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিরামপুর গ্রামের প্রতিবেশীরাও শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তারা বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের খোঁজ নিচ্ছেন এবং সমবেদনা জানাচ্ছেন।

পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নজরুল। তার মৃত্যুর খবরে সেই স্বপ্নের জায়গায় এখন শোক, ঋণ আর অনিশ্চয়তা। শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে তার লাশ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন বাবা-মা।