...|...|...

সারাদেশ

সম্প্রীতির অনন্য নজির

একই উঠানে মসজিদ-মন্দির, নামাজের সময় বন্ধ থাকে পূজা

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১২:৩০
Shares
একই উঠানে মসজিদ-মন্দির, নামাজের সময় বন্ধ থাকে পূজা

একই উঠানে মসজিদ-মন্দির। ছবি: সংগৃহীত

একই প্রাঙ্গণে পাশাপাশি দুটি উপাসনালয়। একটিতে প্রতিদিন ধ্বনিত হয় আজান, অন্যটিতে চলে পূজা-অর্চনা। মসজিদ ও মন্দিরের মধ্যবর্তী দেয়ালের দূরত্ব মাত্র তিন ফুট। অথচ ধর্মীয় ভিন্নতা কখনো হয়ে ওঠেনি বিরোধের কারণ। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি। 

লালমনিরহাট শহরের পুরান বাজারের কালীবাড়ি এলাকায় প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা জামে মসজিদ ও কালীমন্দির যেন ধর্মীয় সম্প্রীতির এক বিরল নিদর্শন।

স্থানীয় সূত্র ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৩৬ সালে লালমনিরহাটের পুরান বাজার এলাকায় কালীবাড়ি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কয়েক বছর পর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বাড়তে থাকে সেখানে। তাদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে মন্দিরের পাশে তৈরি করা হয় একটি ছোট টিনের ঘর। সময়ের সাথে সেই অস্থায়ী নামাজের স্থানই পরিচিতি পায় ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ নামে।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। বদলেছে স্থাপনার ধরন, উন্নত হয়েছে অবকাঠামো, পরিবর্তন এসেছে আশপাশের পরিবেশেও। তবে দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা এখনো অটুট রয়েছে। একই উঠানে পাশাপাশি থেকে নিজেদের ধর্মীয় আচার পালন করছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

কালীবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত সুমন কুমার চক্রবর্তী বলেন, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা এখানে পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। আজানের সময় পূজার বাদ্যযন্ত্র ও কাঁসর বাজানো বন্ধ রাখা হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের সহযোগিতা করেন।

এ এলাকার দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির পরিবেশের প্রশংসা করেছেন লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, দুই ধর্মের মানুষ পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। ঐতিহাসিকভাবেই এখানে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিদ্যমান।

জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এই দৃষ্টান্ত শুধু লালমনিরহাটের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই ইতিবাচক বার্তা দেয়। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে জেলা প্রশাসন সব সময় সচেষ্ট রয়েছে।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে কালীবাড়ি মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু একই উঠানে মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থানকে বাংলাদেশের জন্য অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধন বজায় রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একসাথে বসবাস করছেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলোতে মুসলমানেরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। একইভাবে মুসলমানদের নামাজের সময় মসজিদের আশপাশে ঢাক-ঢোলসহ পূজার বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ও উৎসবের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের এমন চর্চা প্রশংসার দাবি রাখে।

আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে উদ্‌যাপনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী।

মাত্র তিন ফুটের ব্যবধান দুই উপাসনালয়ের দেয়ালের মধ্যে। কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরির বদলে সেই উঠানই হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ও সম্প্রীতির প্রতীক।