...|...|...

বিশ্ব

চীনা গোয়েন্দা সহায়তায় মার্কিন ঘাঁটিতে যেভাবে নিখুঁত হামলা চালাচ্ছে ইরান

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:৩০
Shares
চীনা গোয়েন্দা সহায়তায় মার্কিন ঘাঁটিতে যেভাবে নিখুঁত হামলা চালাচ্ছে ইরান

ছবি: সংগৃহীত

চীনের সরবরাহ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও গোয়েন্দা সহায়তায় ইরানের মার্কিন স্থাপনা ও জাহাজে হামলার সক্ষমতা আরও কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মার্কিন গোয়েন্দা কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের লক্ষ্যভেদের সক্ষমতায় নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। চীনা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভূ-স্থানিক তথ্য ইরানকে হরমুজ প্রণালীর জাহাজগুলোর গতিবিধি শনাক্ত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আরও নির্ভুল হামলা চালাতে সহায়তা করছে।

সূত্রগুলোর তথ্যমতে, জুলাইয়ে জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার ক্ষেত্রেও চীনা গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে এমন নির্ভুল হামলা চালানো কঠিন ছিল।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, চীনের সরবরাহ করা ভূ-স্থানিক তথ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের গতিবিধি শনাক্তে ইরানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এর ফলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদে সফলতার সম্ভাবনাও বেড়েছে।

অন্য দুটি সূত্রের দাবি, এই তথ্যের সহায়তায় ইরান অপেক্ষাকৃত সাধারণ মানের তাপ-অনুসন্ধানী ড্রোন ব্যবহার করেও জাহাজের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারছে। ড্রোনগুলো আকাশে ওড়ার পর দিক পরিবর্তন করতে না পারলেও, সঠিক সময়ে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার পেছনে শুধু চীনা সহায়তাকেই কারণ হিসেবে দেখছেন না মার্কিন কর্মকর্তারা। রাশিয়ার কারিগরি সহায়তা এবং চলমান সংঘাত থেকে ইরানি বাহিনীর অর্জিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাকেও এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের সহায়তার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন। চীনা সরকার সরাসরি নির্দেশ দিয়ে এই সহায়তা দিচ্ছে, নাকি পরোক্ষভাবে তা ঘটতে দিচ্ছে—সেটিও স্পষ্ট নয়। বেইজিং ঠিক কতটা সহায়তা করছে, তা নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীন হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা বন্ধ করতে চায় বলে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কারণ, এই অস্থিরতার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রণালীর নির্দিষ্ট এলাকায় জাহাজ পৌঁছানোর পর ইরান বিপুলসংখ্যক তাপ-অনুসন্ধানী ড্রোন ছুড়ে মার্কিন সামরিক প্রহরায় থাকা জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, ইরানি ড্রোনগুলোর প্রযুক্তি খুব অত্যাধুনিক না হলেও চীনা স্যাটেলাইট চিত্রের সহায়তায় মার্কিন প্রহরা কার্যক্রম অনুসরণ করে উপযুক্ত সময়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক একটি প্রহরা অভিযানে মার্কিন বাহিনী এক ডজনের বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত এবং প্রায় ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো হয়।

গোয়েন্দা সহায়তার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার কারিগরি সহায়তা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের দিকনির্ণয় বা নির্দেশনা ব্যবস্থার উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা চীনের সহায়তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মে মাসে ইরানের সামরিক হামলা সহজ করে দেওয়ার অভিযোগে চীনের তিনটি স্যাটেলাইট কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এসব কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্যের এমন ছবি সরবরাহ করেছিল, যা ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডু শুক্রবার বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে ইরানকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে দাবি করেছিলেন, চীন এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি যা ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের গতিপথ বদলে দিয়েছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে চীন সহযোগিতামূলক আচরণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে জুলাইয়ের হামলায় চীনা স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি প্রথম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উঠে আসে। এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, চীন আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলে এবং সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে চীনের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানোর প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে।

এদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ওপর হুমকি বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা পর্যালোচনায় ইরানের নিয়মিত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতার কথাও উঠে এসেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সাধারণত কম থেকে মাঝারি উচ্চতায় উড়ে। এসব হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে হচ্ছে।

২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পরও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সেই সময়ের তুলনায় এখন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনেক বেড়েছে।

পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোতে ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ইরান ও তাদের সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় মার্কিন সেন্টকম কর্মী, সামরিক সরঞ্জাম ও সংরক্ষণাগারের কিছু অংশ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।

এদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনে চীনের তৈরি দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ আমদানিও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, চীনের তৈরি যন্ত্রাংশ ছাড়া ইরানের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতো।

আরেক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইরানের সামরিক সরঞ্জাম পুনর্গঠনের এই প্রবণতা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর দাবি, মার্কিন সামরিক অভিযান পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়াও ইরানকে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে।