...|...|...

সারাদেশ

চট্টগ্রামে মহামারী রূপ নিচ্ছে হাম: ৭ মাসে আক্রান্ত ৮ হাজারের অধিক

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৮:১৮
Shares
চট্টগ্রামে মহামারী রূপ নিচ্ছে হাম: ৭ মাসে আক্রান্ত ৮ হাজারের অধিক

চট্টগ্রাম মহানগরী এবং জেলার ১৫টি উপজেলায় আশঙ্কাজনক ও মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাম। গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৮ হাজার ৮০ জন শিশু আক্রান্ত হয়ে বা হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৭৮৪ জন শিশু চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরলেও বর্তমানে ২৯৬ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। রোগটির ভয়াবহতায় এ পর্যন্ত মোট ২১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং ১৮ জন স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলাটির ১৫টি উপজেলার চেয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতেই এই সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে তীব্র।

এ পর্যন্ত মহানগরে সন্দেহজনক ও আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ৭১২ জন শিশু। যার মধ্যে ৭ হাজার ৪২৫ জন সুস্থ হয়ে ফিরেছে এবং ২৮৭ জন এখনো ভর্তি রয়েছে। নগরীতে নিশ্চিত হাম শনাক্তের সংখ্যা ৪৮৬ জন এবং উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ জন শিশু।

১৫টি উপজেলায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৬৮ জন শিশু, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৩৫৯ জন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছে ৯ জন। উপজেলায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৫৭ জনের শরীরে এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪ জন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৯৬০টি রক্ত বা শারীরিক নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে চূড়ান্তভাবে ৭৪৩ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের স্থায়িত্ব ও উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সংক্রমণের কারণে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর। হাসপাতালটিতে মোট বিশেষায়িত হাম ইউনিটের শয্যা রয়েছে ৫০টি, পিএসইউ ওয়ার্ডে হামের জন্য বরাদ্দ শয্যা ১০টি এবং আইসোলেশন ওয়ার্ডে রয়েছে ১৬টি শয্যা। তবে হাসপাতালটিতে প্রতিটি স্থানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, একেকটি শয্যায় দুটি করে শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ শিশু ও স্বজনকে হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে বিছানা পেতে দিন কাটাতে হচ্ছে। অনেক মা-বাবাকে তাদের অসুস্থ সন্তানকে কোলে চেপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

হালিশহর থেকে আসা শিশু মো. রিফাতের মা শিরিন আক্তার জানান, তার সন্তান হামের মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে চমেক হাসপাতালের মেঝেতে ২৮ দিন ধরে কাতরাচ্ছে, চিকিৎসা সেবা ও শয্যা সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পরিবারটিকে। এছাড়া সাম্প্রতিক তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল ব্যাধিতে পড়া হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা আরও বেশি সংকটময় হয়ে উঠেছে।

চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুছা মিয়া বলেন, হামে আক্রান্ত রোগী সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। হামে আক্রান্ত ১৯০ থেকে ২শ রোগী ভর্তি থাকে। আইসিইউতেও হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। আইসিইউ খালি না হলে ভর্তি দেওয়া যাচ্ছে না। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। হামে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশু চরম অপুষ্টিহীনতা ভুগছে। এদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের শিশু বেশি। যারা হামে টিকা দেয়নি তাদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি।

তিনি আরও বলেন, শনাক্ত হওয়ার আগে নানা উপসর্গ নিয়ে জেনারেল ওয়ার্ডেও হামের রোগী থাকছে। তাদের সংস্পর্শে সাধারণ রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ হচ্ছে। অন্য রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আবার হাম নিয়ে হাসপাতালে আসছে। হামের জন্য পৃথক হাসপাতাল করা গেলে সংক্রমণ কমবে। চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সাজেদুর রহমান বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিন অসংখ্য শিশু হাসপাতালে ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে হামের উৎস নিয়ে ভিড় করছে। আগের ৯ মাস বয়সি শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হতো। এখন ছয় মাস বয়স থেকে হামের টিকা দেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, কোভিডে যেভাবে আইসোলেশন করা সম্ভব হয়েছিল, হামের বেলায় তা হচ্ছে না। যদি কঠোরভাবে আইসোলেশন করা যায় এবং ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা যায়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।