যুক্তরাষ্ট্র ৩৫টি দেশের সঙ্গে গোপন চুক্তির মাধ্যমে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসীকে তৃতীয় দেশে পাঠিয়েছে। এসব ব্যক্তির সঙ্গে ওই দেশগুলোর আগে কোনো সম্পর্ক বা সংযোগ ছিল না। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠেছে বলে জানিয়েছে আরব নিউজ।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের একটি জোটের সহায়তায় ‘ফরবিডেন স্টোরিজ’-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২৫ হাজার ৪৪৭ জনকে তৃতীয় দেশে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যেসব অভিবাসীকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়, তাদের গ্রহণের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে থাকে ওয়াশিংটন।
এই প্রক্রিয়া সহজ করতে সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে অর্থ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ৪১০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।
ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার জনকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৭টি দেশে পাঠানো হয়েছে। আরও সাতটি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে।
চুক্তিগুলোর শর্ত একেক দেশের ক্ষেত্রে একেক রকম। এর মধ্যে কোন কোন দেশের নাগরিকদের গ্রহণ করা হবে এবং অপরাধের রেকর্ড থাকা ব্যক্তিদের নেওয়া হবে কি না—এসব বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে এএফপির এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, আফ্রিকার দেশগুলোকে বহিষ্কৃত অভিবাসীদের গ্রহণে রাজি করাতে ওয়াশিংটন ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে।
আইনজীবীরা এএফপিকে বলেছেন, তৃতীয় দেশে পাঠানো অভিবাসীদের এক ধরনের ‘আইনি অন্ধকূপে’ ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাদের এমন দেশে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হচ্ছে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং যেখানে তাদের অধিকারও অত্যন্ত সীমিত।
‘ফরবিডেন স্টোরিজ’ জানিয়েছে, তৃতীয় দেশে অভিবাসী গ্রহণের বিষয়ে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৪৯টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘অফিস অব রিমাইগ্রেশন’ নামের একটি অপেক্ষাকৃত অপরিচিত বিভাগ এসব আলোচনা ও অর্থ প্রদানের অধিকাংশ কাজ পরিচালনা করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে গঠিত এই বিভাগের প্রধান ৪১ বছর বয়সী কূটনীতিক ক্রিশ্চিয়ান জোভ এরহার্ট। এর আগে তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন।
ক্যামেরুনের সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠানো অভিবাসীদের গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে ক্যামেরুন। এর এক সপ্তাহ পর দেশটি প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের পাঁচ বছর মেয়াদি একটি স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচির চুক্তি করে।
এর পরের মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ক্যামেরুনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাকে আরও ৩০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে। এর লক্ষ্য ছিল শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো। বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের বহনকারী প্রথম বিমানটি ১৪ জানুয়ারি ক্যামেরুনে পৌঁছায়।
তৃতীয় দেশে অভিবাসী পাঠানোর বিনিময়ে সরাসরি অর্থ পাওয়ার চুক্তিও হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র পালাউ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ ৭৫ জন তৃতীয় দেশের নাগরিককে গ্রহণের বিনিময়ে ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার নেওয়ার চুক্তি করে। তবে এখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র তিনজনকে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া এসওয়াতিনির সঙ্গে ৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি চুক্তির আওতায় সম্ভাব্য ১৬০ জনের মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর ৩২ জন সেখানে পৌঁছেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশটি অপরাধের রেকর্ড থাকা বহিষ্কৃত ব্যক্তিদেরও গ্রহণ করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, এসব চুক্তির জন্য বরাদ্দ ৪১০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুক্তি স্বাক্ষরকারী সরকারগুলোর জন্য রাখা হয়েছিল। বাকি অর্থ সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার জন্য ১৭৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার জন্য ১২৩ মিলিয়ন ডলার রয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার কারণে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোও সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ‘ফরবিডেন স্টোরিজ’-কে জানিয়েছে, তারা এসব দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কোনো পক্ষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন তাদের নিজস্ব কার্যপরিধি অনুযায়ী আশ্রয়ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার এক মুখপাত্রও জানিয়েছেন, অর্থায়ন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রধান বিবেচনা হলো—সংস্থাটির সম্পৃক্ততা ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে কি না। সংস্থাটির দাবি, এসব ক্ষেত্রে তাদের সম্পৃক্ততা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


