মানচিত্রে দুটি বিন্দু- একটি কৃষ্ণ সাগরের তীরে, অন্যটি পারস্য উপসাগরের মুখে। দূরত্ব হাজার হাজার মাইল। ইতিহাস আলাদা, ভাষা আলাদা, শত্রু-মিত্রও আলাদা। তবু ২০২৬ সালের আগস্টে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ যেন একই গল্পের দুই অধ্যায়- এক গল্প, যেখানে পরাশক্তির সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের পুরোনো ধারণায় ফাটল ধরেছে এবং বিশ্ব ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে এক নতুন বহুমেরু বাস্তবতায়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ঠিক এই জায়গাটিতেই আঙুল রেখেছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত দেখিয়েছে- পরাশক্তিরা আর আগের মতো সহজে নিজেদের ইচ্ছা অন্য রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিতে পারছে না।
তার ভাষায়, পরাশক্তিদের এখন নিজেদের ক্ষমতার সীমা বুঝতে হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমছে, নতুন শক্তির উত্থান হচ্ছে এবং বিশ্ব ক্রমেই বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। এটাই সম্ভবত এই দুই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল দ্রুত সামরিক চাপ দিয়ে তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা। কিন্তু ছয় মাস পরও ইরান টিকে আছে। বরং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অসম যুদ্ধকৌশল দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য যুদ্ধের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণকে পরিণত করেছে তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্রে। গুতেরেসও বলেছেন, ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিও সব পরিস্থিতিতে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে না।
এখানে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র নয়- বরং ‘কম খরচে বড় ক্ষতি করার সক্ষমতা’। সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে হচ্ছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরোধ ব্যবস্থা। অর্থনীতির ভাষায় এটি এক অসম লড়াই; কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ ডলারের অস্ত্র ঠেকাতে ব্যয় হচ্ছে তার চেয়ে বহু গুণ বেশি।
আর হরমুজ? সেটিই তেহরানের ‘ট্রাম্প কার্ড’। বিশ্বের তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সংঘাতের পর সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
অর্থাৎ, ইরান হয়তো সামরিক শক্তির প্রচলিত সংজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়; কিন্তু যুদ্ধের খরচ নির্ধারণের ক্ষমতায় সে ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এটাই বড় পরিবর্তন।
ইউক্রেনের গল্পটাও ভিন্ন নয়। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি। ২০২২ সালে মস্কোর প্রত্যাশা ছিল দ্রুত কিয়েভকে পরাস্ত করা। চার বছরেরও বেশি সময় পর যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। বরং ইউক্রেন নিজস্ব ড্রোন ও দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার গভীর অভ্যন্তরে আঘাত হানছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউক্রেন এখন শুধু পশ্চিমা অস্ত্রের গ্রহীতা নয়; যুদ্ধক্ষেত্রে তৈরি করেছে এমন কিছু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যার প্রয়োজন এখন অন্যদেরও হচ্ছে। ইরান সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন ড্রোন প্রতিরক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছে এবং ইউক্রেন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ড্রোন-প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে।
এ যেন ভূরাজনীতির এক অদ্ভুত উল্টোচিত্র- যে রাষ্ট্রকে একসময় রক্ষা করতে হচ্ছিল, তার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাই এখন পরাশক্তির প্রয়োজন হচ্ছে।
এখানে অবশ্যই একটি পার্থক্য জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ভুল। দেশটি এখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়- একসঙ্গে কতগুলো যুদ্ধ সামলানো সম্ভব? ইরান সংঘাতের পর মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্তরের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ইউক্রেনের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, প্যাট্রিয়ট-এর প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টের এর উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় মিত্র এবং ইউক্রেন- সবার চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
এটাই ‘স্ট্রাটেজিক ওভারস্ট্রিচ’— যেখানে পরাশক্তির শক্তি হারায় না, কিন্তু একই সময়ে বহু ফ্রন্টে প্রয়োগ করতে গিয়ে তার সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
রাশিয়াও এই যুদ্ধে সামরিকভাবে অজেয় নয়- এই ধারণাটি ভেঙে গেছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধেও তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্র যে দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চপ্রযুক্তি ও অসম যুদ্ধ চালাতে পারে- তার প্রমাণ মিলেছে।
তবে রাশিয়াকে পরাজিত বলা যাবে না। বরং যুদ্ধ তাকে আরও বেশি যুদ্ধ-অর্থনীতিনির্ভর ও অভিযোজনক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এখানেই ইউক্রেন যুদ্ধের দ্বৈত শিক্ষা- পরাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু পরাশক্তি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায় না।
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই। আগে বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির অর্থ ছিল- বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান, পারমাণবিক অস্ত্র, বিশাল সেনাবাহিনী। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে- ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা, সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র, ভূগোল, জ্বালানি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ক্ষমতা।
ইরানের হাতে হরমুজ। ইউক্রেনের হাতে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা। রাশিয়ার হাতে বিশাল সামরিক-শিল্পভিত্তি। চীনের হাতে অর্থনীতি ও বাণিজ্য। আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত সামরিক ও আর্থিক শক্তি। ফলে বিশ্ব আর একক শক্তির নির্দেশে চলছে না।
এই দুই যুদ্ধের অভিঘাতে ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, চীন রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করছে, আর ভারত, সৌদি আরব, তুরস্কসহ গ্লোবাল সাউথ- এর বহু দেশ একক কোনো শিবিরে পুরোপুরি ঢুকে না গিয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখছে।
জাতিসংঘও এই পরিবর্তনের চাপ অনুভব করছে। গুতেরেস বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়ছে এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
তাই ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধকে শুধু দুটি যুদ্ধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আসলে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার সক্ষমতার পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র এখনও পরাশক্তি। রাশিয়াও তাই। কিন্তু ইরান ও ইউক্রেন দেখিয়ে দিয়েছে- পরাশক্তি হওয়া মানেই যুদ্ধের ফল নিজের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করার নিশ্চয়তা নয়। সম্ভবত এটাই ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক শিক্ষা।
বিশ্ব আর এমন জায়গা নেই, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র শুধু শক্তি দেখিয়ে দুর্বল রাষ্ট্রকে নত করতে পারে। এখন দুর্বল রাষ্ট্রও এমন মূল্য নির্ধারণ করতে পারে, যা পরাশক্তিকে হিসাব বদলাতে বাধ্য করে।
আর সেই বদলে যাওয়া হিসাবের নামই- নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা।

