...|...|...

সারাদেশ

অর্পনার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, ২০ হাজার টাকায় বদলে গেল জীবন

রাজন হোসেন তৌফিক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:১৫
Shares
অর্পনার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, ২০ হাজার টাকায় বদলে গেল জীবন

অর্পনা রানী সরকার (৪০)। ছবি: টাইমস টুডে

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের ইটা বড়বাড়ি গ্রাম। ৮০ থেকে ৮৫টি পরিবারের এই গ্রামে কৃষিই প্রধান পেশা। এরই মধ্যে টিনের একটি বসতঘরের এক পাশে ছোট্ট একটি দোকান। সেখানেই বসে আছেন অর্পনা রানী সরকার (৪০)।

চার বছর আগে স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে দুটি গরু বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় নেমে এসেছিল অন্ধকার। সেই কঠিন সময় থেকে ২০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ান অর্পনা। এখন তার ছোট দোকানের আয়েই চলছে সংসার, চলছে দুই মেয়ের পড়াশোনা।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অর্পনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ঘরের একটি অংশজুড়ে তার ব্যবসা। দেয়ালে দড়ি দিয়ে ঝুলছে চানাচুর, চিপস ও বিস্কুট। পাশে সারি করে রাখা লবণ, মরিচ, তেল ও সাবানের প্যাকেট। বসার জন্য নেই চেয়ার-টেবিল। ক্রেতা এলে দাঁড়িয়েই পণ্য তুলে দেন তিনি।

গ্রামের মানুষই তার দোকানের প্রধান ক্রেতা। অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্য বাকিতে নিয়ে মাস শেষে পরিশোধ করেন।

যেভাবে সব হারিয়েছিলেন অর্পনা

অর্পনার স্বামী জিতেন্দ্র সরকার পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তার আয়েই চলত চার সদস্যের সংসার। হঠাৎ জিতেন্দ্রর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।

অর্পনা বলেন, “চিকিৎসার খরচ জোগাইতে বাড়ির দুইটা গরু বেচি দিলাম। সঞ্চয়ের সব টাকাও শেষ। অপারেশনের পরে ডাক্তার কইলা ভারী কাম করা যাইতো নায়। তখন সংসার কেমনে চলব, বাইচ্চাইনতোরে লেখাপড়া কেমনে করাইমু-এই চিন্তাত ঘুম আওয়া বন্ধ অই গেছিল।”

২০ হাজার টাকার ঋণে নতুন শুরু

হতাশা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন অর্পনা। ঘরের এক কোণায় শুরু করেন ছোট দোকান।

শুরুটা সহজ ছিল না। অর্পনা বলেন, প্রথম ছয়-সাত মাস লস খাইছি। বুঝতাম না কেমনে কী করতাম। আস্তে আস্তে সব শিখছি। এখন হিসাবও করতে পারি। আগে তো থ্রি পর্যন্ত পড়ছি।

শুরুতে শুধু লবণ-মরিচ বিক্রি করতেন তিনি। পরে স্বামীর মাধ্যমে শহর থেকে পণ্য আনতে শুরু করেন। বর্তমানে প্রতি বৃহস্পতিবার কোম্পানির লোকজন ভ্যানে করে দোকানের মাল দিয়ে যান।

দোকানই এখন সংসারের ভরসা

পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন অর্পনা। বর্তমানে দোকান থেকে প্রতি মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়েই চলে সংসার। ইতোমধ্যে ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করেছেন।

তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দুই মেয়ের পড়াশোনা। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। স্বামী জিতেন্দ্রও এখন আগের চেয়ে সুস্থ। কিছু কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করেন।

গ্রামের মানুষের আস্থার জায়গা

ইটা বড়বাড়ি গ্রামের মানুষের কাছে এখন ভরসার জায়গা অর্পনার দোকান। হাওর এলাকা থেকে বাজার দূরে হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে অনেকেই তার দোকানে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মালতি রানী বলেন, অর্পনা দিদির দোকান না থাকলে আমাদের ৩ কিলোমিটার হেঁটে বাজারে যাওয়া লাগত। সে বাকিও দেয়, বিপদে সাহায্যও করে।

স্বপ্ন বড় দোকানের

অর্পনার এখন স্বপ্ন দোকানটি আরও বড় করার। তিনি বলেন, ইচ্ছা আছে দোকানটা আরও বড় করার। কিন্তু আর ঋণ নিতাম চাই না। যদি কোনো সহযোগিতা পাই, তাইলে গ্রামের সড়কের পাশে দোকানটা নিয়া যাইতাম। তাইলে আরও মানুষ আইত।

অর্পনা রানী সরকারের গল্প শুধু একটি ছোট দোকানের গল্প নয়, এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। স্বামীর অসুস্থতা, পুঁজির সংকট আর নানা বাধা পেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন-ইচ্ছাশক্তি থাকলে বদলে দেওয়া যায় জীবন।

মাত্র ২০ হাজার টাকার ঋণ আর অদম্য মনোবলে একটি পরিবারের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন হাওরপারের এই নারী উদ্যোক্তা। এখন তিনি গ্রামের অন্য নারীদের জন্যও হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা।