...|...|...

সারাদেশ

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা না পেয়ে বাড়তি টাকা গুনছেন ১০ লাখ মানুষ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:৫২
Shares
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা না পেয়ে বাড়তি টাকা গুনছেন ১০ লাখ মানুষ

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি: সংগৃহীত

চায়ের রাজধানী ও পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গল। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখানকার ১০ লাখ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজারের বেশি রোগী এখানে আসেন। 

কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকার পরও এই হাসপাতালে গত ৩ মাস ধরে বন্ধ এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে শহরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি টাকা।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের এক্স-রে কক্ষের দরজায় ঝুলছে তালা। ভেতরে পড়ে আছে ১২ বছরের পুরনো মেশিন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকাই মূল কারণ। চলতি বছরের জুন থেকে বন্ধ। কারণ এক্স-রে টেকনোলজিস্ট নেই। ব্র্যাকের প্রকল্পের আওতায় একজন ছিলেন, তিনিও এখন নেই। আলট্রাসনোগ্রাফি বন্ধ, প্রায় ৩ মাস ধরে বন্ধ। কারণ সনোলজিস্ট চিকিৎসক নেই।

অথচ হাসপাতালে রয়েছে ১টি এক্স-রে মেশিন এবং ২টি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন। ১২ বছর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া অ্যানালগ এক্স-রে মেশিনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারি হাসপাতালে ফ্রি বা নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষার আশায় আসা রোগীরা ফিরে যাচ্ছেন হতাশ হয়ে।

সামিয়া বেগম বলেন, মেরুদণ্ডের ব্যথার জন্য এক্স-রে করাতে এসেছিলাম। বলল মেশিন বন্ধ। পরে বাইরের ক্লিনিকে ৬০০ টাকা দিয়ে করালাম। সরকারিতে ২০০ টাকায় হতো। আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে এত টাকা দেওয়া কষ্টকর।

তানিয়া জামান জানান, আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে এসে শুনলাম ডাক্তার নেই। বাইরে থেকে করিয়ে আনতে বলল। ১০০০ টাকা লেগেছে। সরকারিতে ৩০০-৪০০ টাকায় হয়।

একজন চা শ্রমিক বলেন, কোমরের ব্যথা নিয়ে এসেছিলাম। এক্স-রে বন্ধ শুনে শহরে গিয়ে করালাম। সেখানে বেশি টাকা নিল। সরকারি হাসপাতালে থাকলে আমার উপকার হতো।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, হাসপাতালে এক্স-রে টেকনোলজিস্ট, সনোলজিস্ট চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে। সীমিত জনবল নিয়েই আমাদের সেবা চালাতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান মেশিনটি অ্যানালগ। ডিজিটাল মেশিন, সনোলজিস্ট ও টেকনোলজিস্ট না থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করেছি।

স্থানীয় চিকিৎসকরা বলছেন, এক্স-রে ও আল্ট্রাসাউন্ড ছাড়া রোগ নির্ণয় অসম্ভব। হাড় ভাঙা, নিউমোনিয়া, পেটের ব্যথা, গর্ভবতী মায়েদের পরীক্ষা - সবকিছুই এখন বাইরে করতে হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। দুর্ঘটনা, ফুড পয়জনিং, চা-বাগানে কাজ করতে গিয়ে আঘাত - এসবের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার বড় ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু মৌলিক পরীক্ষাই যখন নেই, তখন পর্যটকসহ স্থানীয়দের ভরসা কোথায়।

৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ৮০০-১০০০ রোগী। শয্যা সংকট, ডাক্তার সংকটের মধ্যেও হাসপাতালটি কোনোমতে চলছে। তার উপর মেশিন থাকা সত্ত্বেও সেবা বন্ধ থাকায় জনঅসন্তোষ বাড়ছে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও রোগীরা এক্স-রে টেকনোলজিস্ট ও সনোলজিস্ট চিকিৎসক পদে দ্রুত নিয়োগ, অ্যানালগের পরিবর্তে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সরবরাহ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি চান।

সরকার কোটি টাকা খরচ করে মেশিন দিয়েছে। কিন্তু সেই মেশিন চালানোর মানুষ নেই। ফলে মেশিন আছে, পরীক্ষা নেই, এই প্রবাদই এখন শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাস্তবতা। চায়ের রাজধানীর মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত এই সংকট সমাধান করা না হলে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। সরকারি হাসপাতালের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।