মৌলভীবাজারের বড়লেখায় প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে প্রকৃতি ধ্বংসের মহোৎসব। উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের পূর্ব-দৌলতপুর গ্রামে শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরেই প্রকাশ্যে দিবালোকে কাটা হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু প্রাকৃতিক টিলা।
ট্রাক আর ট্রাক্টরে করে সেই মাটি পাচার করে ভরাট করা হচ্ছে আশপাশের নিচু জমি। পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পূর্ব-দৌলতপুর মৌজায় মৃত আলকাছ আলীর মালিকানাধীন বিশাল আকৃতির একটি প্রাকৃতিক টিলার ওপর ৮-১০ জন শ্রমিক শাবল ও কোদাল দিয়ে মাটি কাটছেন। ওপর থেকে কেটে ফেলা মাটি গড়িয়ে পড়ছে নিচে।
নিচে অপেক্ষমান ট্রাক ও ট্রাক্টরে সেই মাটি ভরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জায়গায় বিক্রির জন্য। ইতোমধ্যে টিলাটির প্রায় ৭০ শতাংশ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। টিলার পাদদেশে সৃষ্টি হয়েছে ৩০ ফুট গভীর খাদের। যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে এই টিলা কাটার উৎসব চলছে। দিনের বেলায় শ্রমিকরা কাটে, আর রাতের আঁধারে ট্রাকে করে মাটি পাচার হয়। টিলা কাটার শব্দে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ এই চক্রটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই কাজ করছে বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
এই টিলা শুধু মাটির স্তূপ নয়, এটি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। এই টিলার গাছপালা, লতাপাতা অসংখ্য পাখি ও জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। টিলা কাটার ফলে একদিকে যেমন ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। বর্ষা মৌসুমে এই টিলা কাটার কারণে আশপাশের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে।
পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী টিলা বা পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনে টিলা কাটার অপরাধে ১০ বছরের জেল এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই টিলা কাটতে পারবে না।
অথচ পুলিশ ফাঁড়ির পাশেই এই অপরাধ হচ্ছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। যারা জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা তৈরি করা হোক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে আসেনি। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, টিলা কাটার বিষয়ে আমরা অভিযান পরিচালনা করব। এর আগেও ওই এলাকায় টিলা কাটার অভিযোগে আমরা জরিমানা করেছি। আমরা জেনেছি রাতের আঁধারে লুকিয়ে টিলা কাটা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। কোনোভাবেই টিলা কাটা যাবে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


