হাসপাতালের টিকিট কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে যখন ভেতরে ঢোকার সুযোগ মিলল, চিকিৎসকের বরাদ্দ সময় তখন বড়জোর এক মিনিট! রোগের বিবরণ পুরোটা বলতে না পেরে মন ভরল না রোগীর। আবার, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কোনো দম ফেলার উপায় না পেয়ে শত শত রোগী দেখার ক্লান্তিতে দিনশেষে অর্থনৈতিক ও মানসিক হতাশায় ডুবছেন চিকিৎসকরা। একদিকে চিকিৎসার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার তীব্র সংকট, অন্যদিকে চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রের তীব্র অসন্তোষ এই দুই বিপরীতমুখী বেদনা ও টানাপোড়েনে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে চিকিৎসকদের মেধা নয়, বরং ব্যবস্থার ত্রুটি থেকে জন্ম নেওয়া ‘সময় ও কার্যকর যোগাযোগের অভাব’-ই দায়ী। দেশে ‘রেফারেল পদ্ধতি’ না থাকায় সর্দি-কাশির মতো প্রাথমিক রোগীরাও বিশেষায়িত হাসপাতালে ভিড় করছেন, যার চাপ সামলাতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী দেখার ফলে চিকিৎসকেরা তীব্র ‘বার্নআউট’ বা ক্লান্তিতে ভুগছেন, যা রোগীর সঠিক কাউন্সেলিংয়ের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। মূলত স্বাস্থ্য খাতের এই কাঠামোগত দুর্বলতা ও জনবল সংকটের কারণেই ডাক্তার ও রোগীর মধ্যকার চিরন্তন আস্থার সম্পর্কটি ভেঙে পড়ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা।
অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ের অব্যবস্থাপনা
চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈশ্বিক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, একটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একজন রোগীকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় দেওয়া উচিত, যা রোগের জটিলতাভেদে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত হওয়া আদর্শ। তবে বিশ্বজুড়ে রোগী দেখার এই সময়ে বিশাল বৈষম্য রয়েছে; যেখানে সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশে চিকিৎসকেরা একজন রোগীকে গড়ে ১৫ থেকে ২২ মিনিট সময় দেন, সেখানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে এই সময় গড়ে ১ থেকে আড়াই মিনিটের বেশি হয় না।
চিকিৎসাবিজ্ঞান সতর্ক করে বলছে, ৫ মিনিটের কম সময়ে রোগী দেখা মূলত সঠিক চিকিৎসা নয় বরং দ্রুত প্রেসক্রিপশন লিখে বিদায় করার শামিল, যা ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্ট এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই একটি মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও ডাক্তার-রোগীর পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিটি রোগীর জন্য ন্যূনতম ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রাখাকেই আদর্শ মনে করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসক রোগী প্রতি গড়ে মাত্র ৪৮ সেকেন্ড সময় দিতে পারেন। রোগীর মাত্রাতিরিক্ত চাপের কারণে দেশের বড় হাসপাতালগুলোর আউটডোরে একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ এক থেকে দুই মিনিটের বেশি সময় বরাদ্দ করতে পারেন না।
এই গবেষণার সত্যতা এবং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র যাচাই করতে বৃহস্পতিবার সরেজমিনে এই প্রতিবেদক সাধারণ রোগী সেজে নিজেই লাইনে দাঁড়ান। দেশের বৃহত্তম ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগের মেডিসিন বিভাগে যখন টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়ানো গেল, ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১১টা ১৫ মিনিট। হাতের টিকিটে সিরিয়াল নম্বর ছিল ৫১৯, রুম নং ৫। অর্থাৎ, সকাল থেকে তখন পর্যন্ত ৫১৮ জন রোগী এই বিভাগে টিকিট কেটেছেন। এরপর আরও ২০০ জন কেটেছেন এই বিভাগের টিকেট।
টিকেট লাইন পর্ব শেষ করে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড়ে পা ফেলায় দায়। শেষমেষ কোনোরকম দাঁড়ানো গেলেও এবার ডাক্তার দেখানোর পালা। এমন পরিবেশের মধ্যে রোগীরা কেমন সেবা পান তা জানতে লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন রোগীর কাছে জানতে চাওয়া হয়। রোগীরা জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখানোর পর নিজেদের সমস্যার কথাই বলতে পারেন না। সেখানেই কথা হয় নরসিংদী থেকে পিঠের তীব্র ব্যথা নিয়ে সকাল ৭টায় রওনা দেওয়া ষাটোর্ধ্ব রোকসানা বেগমের সাথে। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় চিকিৎসকের কক্ষে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। জানতে চাইলে ক্ষোভ ও হতাশার সুরে বলেন, ডাক্তার সাহেব আমার মুখের দিকে না তাকিয়েই টেবিলে কাগজ টেনে নিলেন। পিঠের ব্যথার কথা পুরোটা বলার আগেই উনি খপখপ করে তিনটা টেস্ট আর ওষুধের নাম লিখে দিয়ে বললেন, বাইরে গিয়ে টেস্টগুলো করান, পরের রোগী ডাকেন। ভেতরে এক মিনিটও সময় পাইলাম না। ওষুধ পাইলেও বুকটা হালকা হইলো না।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডাক্তারের রুমের ভেতরে একেকবারে একজন করে নয়, একসাথে ৬ জন রোগীকে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এবার এই প্রতিবেদকও অন্যদের মতোও প্রবেশ করেন। সেখানে কর্তব্যরত একজন নারী চিকিৎসক সেখানে দ্রুততার সাথে রোগী দেখছিলেন। ঘড়ি ধরে দেখা গেল, প্রতি রোগীকে গড়ে ৫০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট সময় দেওয়া হচ্ছে। এই প্রতিবেদক যখন নিজের সমস্যার কথা বলতে শুরু করলেন, পুরো বিবরণ শেষ হওয়ার আগেই ওই নারী চিকিৎসক টেবিল থেকে প্রেসক্রিপশন টেনে নিয়ে পরীক্ষা লিখে দেন পাশাপাশি অন্য একটি বিভাগে পাঠান। তিনি সরাসরি জানান, ঠিক আছে, হাতে সময় কম ভাই, অনেক রোগী। আপনি দ্বিতীয় তলার অমুক রুমে যান, এরপর পরীক্ষা করান।
আউটডোর আল্ট্রাসোনোগ্রাফির অবস্থা আরও করুণ। যেখানে প্রতিদিন হাজারো রোগী আসে, সেখানে আল্ট্রা করা হয় মাত্র ৬০-১০০ জনের। সকাল ৫-৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও কাউন্টার বন্ধ পাওয়ায় শুরু হয় দালালি ও টাকার খেলা। অভিযোগ রয়েছে,হাসপাতাল স্টাফ ও আনসার সদস্যদের অনেকেই এর সাথে জড়িত। এতে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগীকে আগে এসেও অপেক্ষা করতে হয়। গত দুদিন ধরে ঘুরেও আল্ট্রা করাতে না পারা এক ভুক্তভোগী নারী (সালমা আক্তার) চোখে-মুখে ছিল কেবলই অসহায়ত্ব।
এমন চিত্র শুধু ঢামেক নয়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল, মিটফোর্ড, কুর্মিটোলা জেনারেল, মুগদা মেডিকেল, পিজি হাসপাতাল (বিএসএমএমইউ), জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল কিংবা মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালসহ রাজধানীর সব সরকারি হাসপাতালেই। আর রাজধানীর বাইরের চিত্র তো আরও সংকটাপন্ন; দেশের জেলা সদর হাসপাতাল এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে আসা হাজারো রোগীর ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা যায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, একজন ডাক্তারের রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে দেখা কেবল কোনো সৌজন্যতা নয় বরং এটি সঠিক ও কার্যকর চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই ‘কনসালটেশন টাইম’ বা পরামর্শের সময়টুকুর ওপরই নির্ভর করে নিখুঁত রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্ট ও ওষুধের ব্যবহার হ্রাস এবং সর্বোপরি ডাক্তার ও রোগীর পারস্পরিক আস্থা। ডাক্তার যখন মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনেন এবং শারীরিক পরীক্ষা করেন, তখন রোগীর অর্ধেক মানসিক চাপ এমনিতেই দূর হয়ে যায় এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে, আমাদের দেশের বাস্তবতায় অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে পর্যাপ্ত সময় দেওয়াটা চিকিৎসকদের জন্য অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হলেও, একটি সফল ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সময় নিয়ে রোগী দেখার কোনো বিকল্প চিকিৎসা বিজ্ঞানে নেই।
বহির্বিভাগের অমানবিক প্রেশার: মানসিক সংকটে চিকিৎসকরাও
চিকিৎসা ব্যবস্থার এই করুণ দশায় রোগীরা যেমন ভুগছেন, তেমনি সমপরিমাণ তীব্র মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন খোদ চিকিৎসকরাও। সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ রোগীর চাপ থাকে, তা সামাল দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের দীর্ঘ সময় কোনো বিরতি ছাড়া একটানা কাজ করতে হয়। একে তো অর্থনৈতিক অসন্তোষ, তার ওপর প্রতিদিন শত শত রোগীর চিৎকার, ক্ষোভ আর বিশৃঙ্খল পরিবেশের মুখোমুখি হয়ে চিকিৎসকরা এক ভয়াবহ মানসিক ক্লান্তির শিকার হচ্ছেন।
বাস্তব চিত্র তুলে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিদিন আউটডোর আমাদের গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী দেখতে হয়। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় এত রোগী দেখা আক্ষরিক অর্থেই এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। একজন মানুষকে ভালো করে দেখার জন্য যে ন্যূনতম সময় প্রয়োজন, তা আমরা দেওয়ার সুযোগই পাই না। সবসময় মাথার ভেতর একটা তাড়া কাজ করে যে, বাইরে আরও শতাধিক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করছে। দিনশেষে বাসায় ফিরে আমরা প্রচণ্ড অপরাধবোধ আর তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগি। মনে হয়, চাকরিটা শুধু কাগজ লেখার যান্ত্রিক কাজ হয়ে গেছে, প্রকৃত সেবার আনন্দটাই হারিয়ে গেছে।
জেলা-উপজেলা শহরের চিত্র আরও করুণ
ঢাকার বাইরে দেশের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, যেখানে চিকিৎসকদের ওপর চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজের অতিরিক্ত মানসিক চাপ সামলাতে হয়।
ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করে এক জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক মুহাম্মদ সাঈদ আল মাহফুজ টাইমস টুডেকে বলেন, প্রতিদিন আউটডোরে একা ১৫০ জনের মতো রোগী দেখেছি। এর পাশাপাশি ইনডোরে ভর্তি ৩০-৩৫ জন রোগীকে রাউন্ড দিতে হয়। লোকবল একেবারেই নেই।
তিনি জানান, এসব মানসিক আর শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বছরখানেক আগে আমার পরিচিত একজন সার্জারির কনসালটেন্ট চাকরি ইস্তফা দিয়ে এমআরসিএস কমপ্লিট করে বিদেশ চলে গেছেন। সেই অতিরিক্ত অপারেশনের লোড আর দাপ্তরিক প্রেশারও এখন আমার একার কাঁধে। ইমার্জেন্সি রোগী এসে আউটডোরের সিরিয়াল মাড়িয়ে রুমে ঢুকে যায়। এর মধ্যে টাউট-বাটপাররা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। সব মিলিয়ে একটা চরম জাঁতাকলের মধ্যে আমাদের ডিউটি করতে হয়। আরেকজনের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে গিয়ে চিকিৎসকের নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য যে কতটা ভেঙে পড়ছে, তা দেখার কেউ নেই।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম বেতন বাংলাদেশে
চিকিৎসকদের এই পেশাগত ও মানসিক ক্লান্তির সমান্তরালে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক হতাশা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন-ভাতার দিক থেকে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ডাক্তারদের বার্ষিক আয় যেখানে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা, সেখানে শ্রীলঙ্কায় ডাক্তার পান ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা, নেপালে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং পাকিস্তানে ৭ থেকে ৯ লাখ টাকা। উন্নত বিশ্বের সাথে তুলনা করলে এই বৈষম্য আরও প্রকট, কারণ যুক্তরাজ্যে একজন ডাক্তার বার্ষিক প্রায় ৯৮ লাখ টাকা আয় করেন।
এই চরম বেতন বৈষম্য আর জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে বাধ্য হয়ে অনেক চিকিৎসককে হাসপাতালের ডিউটি শেষে নিজস্ব প্রাইভেট চেম্বারে বসতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সরকারি খাতে যেখানে মোট স্বাস্থ্য জনবল ১.৫১ লাখ, সেখানে বেসরকারি খাতে তা ১.৯০ লাখ। কর্মী সংখ্যায় বেসরকারি খাত এগিয়ে থাকলেও চিকিৎসকদের জীবনযাত্রার মানের কোনো টেকসই উন্নয়ন হয়নি। ফলে একদিকে সরকারি হাসপাতালে সময়ের অভাব ও তীব্র মানসিক প্রেশার, অন্যদিকে প্রাইভেট চেম্বারের বাড়তি খরচ ও সীমিত সুযোগ-সুবিধা সব মিলিয়ে রোগীরা এক জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। আর চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিদেশমুখী হওয়ায় দেশ ভয়াবহ ‘মেধা পাচার’- এর শিকার হচ্ছে।
উত্তরণের উপায় ও সরকারি পরিকল্পনা
দেশের স্বাস্থ্যসেবার এই বিশাল চাপ সামাল দিতে ও মানুষের ভোগান্তি কমাতে একটি বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দেশের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ঘটাতে খুব শিগগিরই ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেবে সরকার। এর মধ্যে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ৪,৭০০ জন এবং বিডিএস ডিগ্রিধারী ৩০০ জন চিকিৎসক রয়েছেন।
তবে চিকিৎসাব্যবস্থার এই গভীর সংকট কাটাতে কেবল চিকিৎসক নিয়োগই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে চিকিৎসার এই আস্থার সংকট ও চিকিৎসকদের হতাশা দূর করতে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢালাওভাবে। তারা মনে করেন, বর্তমানে উপজেলা বা জেলা পর্যায় থেকে রোগীরা সরাসরি বিশেষায়িত বা বড় হাসপাতালে চলে আসায় ঢাকার চিকিৎসকদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ সামলাতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি কার্যকর ও বাধ্যতামূলক রেফারেল সিস্টেম বা রোগী স্থানান্তরের নিয়ম চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় জটিল রোগী দেখার সুযোগ পান। একই সাথে চিকিৎসা যেহেতু কেবল প্রেসক্রিপশন বা ওষুধ নির্ভর নয় এবং এর সাথে মানবিক আচরণ জড়িত, তাই চিকিৎসকদের মেডিকেল কারিকুলাম ও পেশাগত জীবনে পেশাদার আচরণ ও রোগী কাউন্সিলিংয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগের জটিলতা রোগীকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বললে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ অনেক কমে যায়। এর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালে একজন চিকিৎসক দৈনিক সর্বোচ্চ কতজন রোগী দেখবেন তা সুনির্দিষ্টভাবে ফিক্স করে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে চিকিৎসকদের কর্মক্ষমতা ও সেবার মান বজায় থাকে। একই সাথে হাসপাতালের ভেতরে রোগীর অতিরিক্ত দালালি ও বিশৃঙ্খলা দূর করার পাশাপাশি চিকিৎসকদের বেতন বৈষম্য কমিয়ে এনে কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিকিৎসকদের জন্য একটি মানবিক ও আকর্ষণীয় কর্মপরিবেশ তৈরি করা জরুরি, কারণ রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং চিকিৎসকদের জীবনযাত্রার মান ফিরে এলেই কেবল দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
আউটডোর কমপ্লেক্স ও তিন শিফটে সেবা জরুরী
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা.বেনজির আহমেদ টাইমস টুডেকে বলেন, আমাদের সারাদেশে উপজেলা থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সকল হাসপাতালেই বহির্বিভাগ বা আউটডোর সার্ভিসটি তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। এর মূল কারণ, আমাদের ১৮ কোটি মানুষের এই জনবহুল দেশে রোগীর সংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যাধিক কম। ঢাকার কথাই যদি ধরি, প্রায় দুই কোটি মানুষের এই শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আছে মাত্র পাঁচ-সাতটির মতো। এই বিশাল জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি আউটডোরে আসে, তবে সেটি বিশাল সংখ্যায় দাঁড়ায়। অথচ সেই তুলনায় হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারের সংখ্যা, কক্ষ সংখ্যা কিংবা আউটডোরের পুরো স্পেসটাই অত্যন্ত অপর্যাপ্ত।
তিনি বলেন, বর্তমানে আউটডোর নিয়ে আমাদের এখন বড় আকারে ভাবার সময় এসেছে। কারণ, সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয় এবং তার কোনো প্রয়োজনও নেই। আমরা যদি আউটডোর সার্ভিস এবং এখানকার সেবাটাকে ভালো করতে পারি, তাহলে একদিকে যেমন রোগীরা মানসম্মত সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট হবেন, অন্যদিকে এটি হাসপাতালে রোগী ভর্তির চাপ কমাতেও বড় ভূমিকা রাখবে। আউটডোরেই যদি ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেই রোগীর আর ইনডোরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসঙ্গ টেনে এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, এটাকে যদি সত্যিই একটি আদর্শ আউটডোর বানাতে হয়, তবে সেটার জন্য বিশাল একটা কমপ্লেক্স দরকার। যেখানে অন্তত ১০০ থেকে ২০০ জন মেডিকেল অফিসার থাকবেন, সমসংখ্যক কক্ষ থাকবে এবং একই সাথে আউটডোরেই পর্যাপ্ত প্যাথলজি ফ্যাসিলিটিজ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
দেশের মানুষকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হয়, তবে তাদের কাজের সময়ের আগে বা পরে হাসপাতালে আসার সুযোগ দিতে হবে উল্লেখ করে বেনজির আহমেদ বলেন, এই লক্ষ্যে আমি হাসপাতালগুলোতে ভোর থেকে শুরু করে রাত ১২টা পর্যন্ত মোট তিন শিফটে সেবা চালুর প্রস্তাব করছি। ভোর থেকে দুপুর ১২টা, দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা এইভাবে তিন শিফটে যদি অধিকসংখ্যক মেডিকেল অফিসার দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া যায়, তবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কোয়ালিটি সার্ভিস পাবেন। এর পাশাপাশি আউটডোরে পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের লেখা সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালেই করার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, একই সিস্টেম জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেই করতে হবে। কারণ সবখানেই আমাদের মূল সার্ভিস তিনটি- আউটডোর, ইনডোর এবং ইমার্জেন্সি। তাই জেলা ও উপজেলাতেও আউটডোরের সেবাটা একইভাবে শক্তিশালী করলে ইনডোরের চাপ কমবে এবং মানুষের সুস্থতার হার বাড়বে। বর্তমান সরকার যেভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর কথা চিন্তা করছেন, তা বাস্তবায়ন করতে হলে এই ধরনের বড় পরিবর্তন আনা জরুরি। ছোটখাটো পরিবর্তন দিয়ে বহির্বিভাগের চিকিৎসার পরিমাণগত ও মানগত কোনো সিগনিফিকেন্ট চেঞ্জ (দৃশ্যমান উন্নয়ন) সম্ভব নয়।
চিকিৎসকদের বেতন ও প্রাইভেট প্র্যাকটিস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের সার্বিক জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী সবারই বেতন কম, যা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও সত্যি। চিকিৎসকদের বেতন এমন হওয়া উচিত যাতে একজন কর্মী নিজের কাজের বিনিময়ে পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন ভেবে সন্তুষ্ট থাকেন, অন্যথায় ভালো সার্ভিস আশা করা যায় না। তবে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। এর বিকল্প হিসেবে চিকিৎসকদের মূল বেতনের বাইরে আকর্ষণীয় 'নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স' দিতে হবে। একই সাথে এমন একটি চমৎকার সিস্টেম করা যায়, যেখানে যে চিকিৎসক যত বেশি রোগী দেখবেন, তিনি সেই অনুপাতে অতিরিক্ত এলাউন্স পাবেন। খুব কম খরচে যদি এই পুরো ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে সাধারণ মানুষের জন্য নিশ্চিত করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই বদলে দিতে পারে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (অনকোলজি বিভাগ) সৈয়দ আকরাম হোসেন টাইমস টুডেকে বলেন, আমাদের চিকিৎসকদের যে পরিমাণ কাজের চাপ ও মানসিক ধকল সামলাতে হয়, তা সত্যিই অমানবিক। দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী দেখার পর একজন চিকিৎসকের পক্ষে মানসম্মত সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিরাপদ কর্মপরিবশের অভাব এবং প্রাপ্য সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা না পাওয়াই আজ আমাদের মেধাবী চিকিৎসকদের চরম হতাশ ও বিদেশমুখী করে তুলছে। এই মেধা পাচার রোধ করতে হলে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী চিকিৎসকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস’ গঠন, মেধাভিত্তিক পদোন্নতি, পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
এই অব্যবস্থাপনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগী ও চিকিৎসকের সম্পর্কের ওপর উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে একজন রোগী যখন চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে মাত্র এক মিনিট সময় পান, তখন আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এই পরিস্থিতির জন্য চিকিৎসকদের দোষারোপ না করে ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা, ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং দৈনিক রোগী দেখার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম আরও বলেন, সরকারের আরও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয় হলেও শুধু লোকবল বাড়িয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের পুরো রেফারেল সিস্টেম বা রোগী প্রেরণ পদ্ধতিটি আমূল বদলে ফেলতে হবে। যথাযথ রেফারেল ব্যবস্থা না থাকায় রোগীরা সরাসরি বিশেষায়িত হাসপাতালে চলে আসেন, যার ফলে পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে। এর স্থায়ী সমাধানে ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিবারভিত্তিক জেনারেল প্র্যাকটিশনার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, উপজেলা পর্যায়কে কার্যকর সেকেন্ডারি কেয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোকে কেবল জটিল রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে। বর্তমান সরকারের অঙ্গীকারেও এই বিকেন্দ্রীকৃত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। চিকিৎসকদের অধিকার রক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি ও রোগীদের সঠিক সেবা প্রাপ্তি এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

