ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানের সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিহত করে বিশ্বজুড়ে ‘নায়ক’-এর খ্যাতি পাওয়া ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছারের ছোটবেলার স্বপ্ন কখনো বিমান চালনা ছিল না। পারিবারিক টেক্সটাইল ব্যবসা সামলানোর কথা থাকলেও ১৯ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে এভিয়েশনের প্রেমে পড়ে যান তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বাইয়ের এই অভিজ্ঞ পাইলট সম্পর্কে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও অনুপ্রেরণামূলক তথ্য সামনে এসেছে। গত বুধবার দুবাই থেকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাউইয়ের একটি ফ্লাইটে কো-পাইলটের অতর্কিত ছুরিকাঘাতের শিকার হন স্মিত মাচ্ছার। ১৭৪ জন যাত্রী নিয়ে প্লেনটি বিধ্বস্ত করার সেই আত্মঘাতী চেষ্টা সাহসিকতার সাথে প্রতিহত করেন তিনি। বর্তমানে সৌদি আরবের তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় ককপিটের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে ককপিটের দরজা খোলার সুইচ টিপতে সক্ষম হন। এতে যাত্রীরা ও ক্রুরা ভেতরে প্রবেশ করে কো-পাইলটকে কাবু করে ফেলেন এবং বিমানে থাকা অন্য দুই পাইলটের সহায়তায় বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করানো হয়। এই বীরত্বের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে ‘হিরো’ বলে অভিহিত করেছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে ‘সত্যিকারের নায়ক’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
প্রায় ১৫ বছরের কর্মজীবনে প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা বিমান চালনার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বয়োবৃদ্ধ বোয়িং ৭৩৭ ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার বেশ দেরিতেই এভিয়েশন পেশায় এসেছিলেন। গত বছর জালাক মেহতা-র সঞ্চালনায় ইউটিউবের একটি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, অন্য অনেক বিমানচালকদের মতো ছোটবেলার স্বপ্ন এভিয়েশন ছিল না। এটি আমার জীবনে অনেক পরে এসেছে।
পারিবারিক ব্যবসা থেকে আকাশচুম্বী কেরিয়ার
লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, পরিপাটি করে ছাঁটা দাড়িযুক্ত স্মিত মাচ্ছার ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে ভারতের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছিলেন।
স্কুলজীবন শেষ করার পর তিনি পারিবারিক ব্যবসা এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে মুম্বাইয়ের ওয়েলিংকার ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ সম্পন্ন করেন। সেখানেই প্রায় ১৯ বছর বয়সে একটি এভিয়েশন সেমিনারে গিয়ে তিনি প্রথম বিমান চালনা বা ফ্লাইং সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি জানান, সেখানেই এভিয়েশনের পোকা বা নেশাটা আমাকে ধরেছিল। তবে তার এই পেশা নির্বাচন নিয়ে প্রথমে তার মা বেশ ভীত ছিলেন।
পরবর্তীতে নিউজিল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্পাইসজেটে যোগ দেন মাচ্ছার। সেখানে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেয়ে তিনি জুনিয়র পাইলটদের মেন্টরিং করার দায়িত্বে থাকা ‘লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন’ পদে উন্নীত হন। তিনি স্পাইসজেটে ১১ বছর এবং গত চার বছর ধরে ফ্লাইদুবাউইয়ে কাজ করছেন।
নিজের কর্মজীবন সম্পর্কে স্মরণ করে তিনি জানান, অতীতে চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থার কারণে ফ্লাইট ঘুরিয়ে দেওয়া কিংবা ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফ্লাইট ছাড়তে বিলম্ব করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে। তিনি বলতেন, দেরি হওয়া আমার সমস্যা নয়। বিমান থেকে হেঁটে সুস্থভাবে নেমে আসাই আমার মূল লক্ষ্য।
তিনি ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত জীবনকে সবসময় আলাদা রাখার পক্ষে কথা বলতেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ককপিট বা বিমান থেকে বের হওয়ার পর আমি চাই না অন্য কেউ জানুক যে আমি একজন পাইলট। আমি এভিয়েশন নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করি না। যখন আমি ইউনিফর্ম পরি, তখন কোনো বাজে কথা নয়, শুধু নিজের কাজ করো এবং কাজ শেষ করো। ককপিট থেকে বের হওয়ার পর ওটাই শেষ। এ নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন। এখন অন্য কারো আপনাকে প্রয়োজন, আপনার বাচ্চারা আছে, তারা আপনার সাথে খেলতে চায়।


