...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

সরকারি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেটে ব্যস্ত ডা. বিকাশ

রোগী দেখেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মমতা হাসপাতালে

আল জুবায়ের বাদশা
প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৭ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:৩০
Shares
সরকারি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেটে ব্যস্ত ডা. বিকাশ

ডা. বিকাশ কুমার সরকার। ছবি: সংগৃহীত

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা নিশ্চিত করতে সরকার যখন নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, ঠিক তখনই সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বেতন নিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে ডা. বিকাশ কুমার সরকারের বিরুদ্ধে। ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের এই চিকিৎসক বছরের পর বছর সরকারি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে নিজস্ব ও প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখে আসছেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ কয়েক মাসের তথ্যানুসন্ধানে টাইমস টুডে টিমের হাতে এসেছে সরকারি এই চিকিৎসকের ডিউটি ফাঁকির প্রমাণ।

ডা. বিকাশ কুমার সরকার বর্তমানে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বুধবার দুপুর দেড়টার পরই তিনি হাসপাতাল ছেড়ে পাড়ি জমান উত্তরের সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। বৃহস্পতিবার সরকারি অফিস সময় হলেও তিনি সেখানে অবস্থান না করে প্রাইভেট চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেন।

টাইমস টুডে টিম সরেজমিনে চার সপ্তাহ প্রতি বৃহস্পতিবার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে উপস্থিত হলেও তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। সবশেষ ৩ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) এবং শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা অবস্থান করেও তার দেখা মেলেনি। 

যেভাবে চলে দূরবর্তী জেলার প্রাকটিস

অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের সামনের ‘মমতা হাসপাতাল’এবং শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাইস্কুলের সামনে নিজ চেম্বারে রোগী দেখেন। এ ছাড়া প্রতি শুক্রবার শিবগঞ্জ হাসপাতাল রোডের ‘আলিফ ডিজিটাল মেডিকেল সেন্টারে’ রোগী দেখেন তিনি।

প্রতিবেদকের হাতে আসা তার ভিজিটিং কার্ড ও রোগীদের প্রেসক্রিপশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। প্রতি বৃহস্পতিবার মমতা হাসপাতাল ও নিজস্ব চেম্বারে এবং শুক্রবার শিবগঞ্জে রোগী দেখা হয়। তবে, চালাকির আশ্রয় নিয়ে সেখানে রোগী দেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ রাখা হয়নি।

সত্যতা যাচাইয়ে টাইমস টুডের জেলা প্রতিনিধি জসিমউদদীন জোচি বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে ছদ্মবেশে রোগী সেজে মমতা হাসপাতালে সিরিয়াল দেন। তাকে জানানো হয়, ডাক্তার পরদিন বিকেল ৪টায় বসবেন। তবে বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সময়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। কেননা আগেই সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি আর হাসপাতালে যাননি। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, উক্ত হাসপাতালের সামনে বড় করে লেখা রয়েছে, ‘সরাসরি ঢাকা থেকে আগত ডা. বিকাশ কুমার সরকার (মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ) আই.ডি.এইচ মহাখালী’। সাক্ষাতের সময় প্রতি বৃহস্পতিবার। সময়টা উল্লেখ না করে দিলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় প্রতি বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টায় রোগী দেখেন তিনি।

এদিকে, সাংবাদিক পরিচয়ে ডাক্তার সরকারি ডিউটি রেখে কীভাবে রোগী দেখছে প্রাইভেটে-জানতে চাইলে মমতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি ছুটির নোটিশ দেখান। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, পারিবারিক কারণে তিনি বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ছুটিতে রয়েছেন। তবে নোটিশ অনুযায়ী ছুটি ওই দিন শেষ হলেও পরবর্তী কর্মদিবস শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টা পর্যন্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ডাক্তারের একজন রোগী জানান, উনি প্রতি বৃহস্পতিবার রোগী দেখতে আসেন। তিনি নিজেও পরপর তিন সপ্তাহ (বৃহস্পতিবার) তার সন্তানকে এই ডাক্তারকে দেখিয়েছেন। এর আগেও তার নিকটস্থ আত্মীয় ডা.বিকাশকে প্রায় চার মাস ধরে দেখান। 

আকাশপথেও অসম্ভব 

ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩১৭ কিলোমিটার। সড়কপথে গেলে সময় লাগবে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। আর বিমানে গেলে সময় লাগবে ৫০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা, সেক্ষেত্রে ১ ঘণ্টা আগে উপস্থিত থাকবে হবে এয়ারপোর্টে।

তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার অফিস সময় দুপুর আড়াইটার পর হাসপাতাল থেকে রওনা দিলেও এয়ারপোর্টে (ঢাকা) পৌঁছাতে সময় লাগবে সর্বনিম্ন ৩০ মিনিট। তাহলে ঢাকাতেও বাজছে বিকেল ৪ টা। ফলে, বিকেল ৪টায় কোনোভাবেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে রোগী দেখা সম্ভব নয়। 

ক্ষোভ রোগীদের 

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ঘুরে যাওয়া একাধিক রোগী ডা. বিকাশের বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

মহাখালী হাসপাতালে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রাব্বি সিদ্দিকী নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা গ্রামের দিক থেকে অনেক কষ্ট করে সরকারি হাসপাতালে আসি ভালো ডাক্তার দেখাব বলে। এসে শুনি ডাক্তার নাকি চেম্বারে নাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও ওনার দেখা পায়নি। আমাদের মতো গরীব মানুষদের দেখার কি কেউ নাই?

ফাইজা ইসলাম নামের এক রোগী আক্ষেপ করে বলেন, বৃহস্পতিবার এসে দেখি উনার রুম বন্ধ। শুনলাম উনি বৃহস্পতিবারে থাকেন না অন্য জায়গায় রোগী দেখেন। সরকারি হাসপাতালে বেতন নিয়ে যদি প্রাইভেটে ব্যবসা করতে হয়, তবে সরকারি চাকরি ছাড়ে না কেন?

মমতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ 

মমতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে আব্দুর জব্বার টাইমস টুডেকে বলেন, তিনি ছুটি নিয়ে এসেই এখানে চেম্বারে বসেন। উনি প্রায় দুবছর ধরে আপনাদের এখানে রোগী দেখেন বলে অভিযোগ-এই বিষয়ে তিনি বলেন, ওই যে বললাম ডাক্তারদের অনেক সময় অফ ডিউটি,নাইট ডিউটি থাকে তখন রোগী দেখতে পারেন। 

সরকারি নিয়ম যা বলছে

নিয়ম ভঙ্গ ও সরকারি নীতির লঙ্ঘন সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী বছরে নির্ধারিত ২১ দিন নৈমিত্তিক ছুটি পান, যা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে ভোগ করা যায়। কিন্তু ডা. বিকাশ যেভাবে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়ে বা না নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করছেন তাতে তিনি মাসে ৪ দিন এবং বছরে প্রায় ৪৮ দিন ছুটি কাটাচ্ছেন। এই সংখ্যা সরকারের নির্ধারিত বাৎসরিক ছুটির দ্বিগুণেরও বেশি। সরকারি নীতি অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসক কোনো নির্দিষ্ট দিন বা বারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে বা সিস্টেম বানিয়ে প্রতি সপ্তাহে ছুটি নিতে পারেন না। এটি সরকারি অফিস সময় ও চাকরি বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ওপর সরকারি বেতনভোগী হয়ে ছুটির অজুহাতে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা এবং প্রক্সি হাজিরা দেওয়া কেবল পেশাগত অসদাচরণই নয় বরং দণ্ডবিধির আওতায় একটি গুরুতর প্রশাসনিক অপরাধ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের  একাধিক সূত্র জানায়, বিগত প্রায় দুই বছর ধরে ডা. বিকাশ এভাবে সরকারি দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন। বৃহস্পতিবার তার অনুপস্থিতিতে হাজিরা খাতায় অন্য কাউকে দিয়ে প্রক্সি সই করানো হয়, যার বিনিময়ে তিনি তাদের অর্থ প্রদান করেন।

সরকারি খাত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করে কর্মস্থলে প্রক্সি দেওয়া এবং প্রাইভেট ক্লিনিক ব্যবসায় সময় দেওয়ার এই চক্রে হাসপাতাল প্রশাসনের আর কে কে জড়িত তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। ভুক্তভোগী রোগীরা অবিলম্বে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর হস্তক্ষেপ ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। 

অভিযোগের বিষয়ে ডা. বিকাশ কুমার সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিস চলাকালীন সময় আমি হাসপাতালে থাকি, কোনো ধরনের ছুটি বা অফ ডে ছাড়া। আমরা কর্তৃপক্ষকে অবগত না করে আমি হাসপাতাল ত্যাগ করি না। 

তত্ত্বাবধায়কের সাফাই ও দায় এড়ানোর চেষ্টা

তবে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আসমা খানের সঙ্গে টাইমস টুডে টিম যোগাযোগ করলে তিনি ওই চিকিৎসকের পক্ষে সাফাই গান। তিনি বলেন, ডাক্তারদের একটু ছাড় দিতে হয়। তিনি দাবি করেন, বৃহস্পতিবার নয় বরং শুক্রবারে রোগী দেখেন তিনি। অনেক দূর বলে একটা বন্ধ নেন, এরপর শনিবারে এসে অফিস করেন। 

তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, আপনার সাথে কি ওই ডাক্তারের কোনো সমস্যা হয়েছে? বৃহস্পতিবার সরকারি ডিউটি রেখে বাইরে রোগী দেখার নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, এভাবে ইনকোয়ারি করলে আমি আপনাকে উত্তর দিতে পারি না।

একপর্যায়ে দুপুর ২টা ৮ মিনিটে হাসপাতালের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক নিজে কেন নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি দুঃখিত।’

এদিকে অভিযুক্ত ডা. বিকাশ শনিবারও (৫ সেপ্টেম্বর) অফিস করছেন না- এ বিষয়ে জানতে আবারও তত্ত্বাবধায়কের কাছে ফোন দিলে তিনি বিরক্তির সুরে বলেন, তিনি ছুটি নিয়েছেন ভাই।  আপনারা এমন করলে তো খুব সমস্যা; ডাক্তারদের নিজেদের মতো করে চাকরি করতে দেন। উনি বাসায় গিয়ে ছুটি নিয়ে কী করবেন সেটা তো আমার জানার বিষয় না। 

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রমাণ পেলে আপনি কোনো পদক্ষেপ নিবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি  বলেন, আমি একটা শোকজ করতে পারি আর উনি সঠিক জবাব দিলে তো কিছু করার নাই আমার।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপ-সচিব (শৃঙ্খলা-২) আবু সুফিয়ান টাইমস টুডেকে বলেন, আপনারা তথ্য-প্রমাণ দিলে নিয়মানুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।