হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ওই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে (ইরান সময় মঙ্গলবার রাত ১২টা ১৫ মিনিট) এই অভিযান শুরু হয়। সেন্টকমের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতেই এই দফায় দফায় আক্রমণ চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সোমবার রাতভর দেশটির দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস, কিশ ও কেশম দ্বীপ এবং বুশেহর প্রদেশের জাম শহর অন্যতম। তবে বন্দর আব্বাসের পশ্চিমাঞ্চলে একটি আঘাতের ঘটনা ঘটলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় গভর্নর কার্যালয়।
সংঘাতের রেশ ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) দাবি করেছে, ওমানের জলসীমায় থাকা তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় একটি ট্যাংকারে কর্মরত একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন কর্মী আহত হয়েছেন।
এদিকে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ‘নিয়ম লঙ্ঘনকারী’ বেশ কয়েকটি জাহাজে তাদের বাহিনী অভিযান চালিয়েছে এবং বন্দর আব্বাসের কাছ থেকে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক অভিযান শুরু করেছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়ে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদের গুদাম, জ্বালানি ট্যাংক এবং পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ধ্বংস করেছে। এর আগে সোমবার বাহরাইন ও জর্ডানেও একই ধরনের হামলা চালায় ইরান।
গত ১০ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে জানান যে, ৭ জুলাই থেকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের পূর্বানুমতি ছাড়াই আরও ৬০ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ঘোষণা দেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের এই একতরফা সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলের জ্যেষ্ঠ নেতা চাক শুমার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষই মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি থেকে সরিয়ে এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ট্রাম্পের উচিত এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) ঘোষণা করেছে যে, আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনর্বহাল করা নৌ অবরোধ কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইরান ছাড়া অন্য যেকোনো দেশের উদ্দেশ্যে যাওয়া জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজও তল্লাশির পর পার পেয়ে যাবে। তবে কোনো জাহাজ যদি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পণ্য স্থানান্তরের মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা করছে বলে সন্দেহ হয়, তবে সেটিতে তল্লাশি চালানো হবে। নির্দেশ অমান্য করলে সেই জাহাজ ধ্বংস বা অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট।


