দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে মানসিক রোগ ও ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি প্রায় শূন্যের কোঠায়। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব, চিকিৎসকের মারাত্মক সংকট আর নীতিমালার ধীরগতির বাস্তবায়নে খাতটি চরম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন আর সাধারণ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নয় বরং রূপ নিয়েছে নীরব মহামারিতে। কিন্তু উদ্বেগজনক এই বাস্তবতা সামাল দিতে স্বাস্থ্য বাজেটের নগণ্য অংশ ছাড়া আর কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল
মানসিক স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন তথ্য বলছে, সারাদেশে বর্তমানে সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র সাড়ে ৩০০ জনের কাছাকাছি। আর সাইকোলজিস্ট আছেন মাত্র ১৭০ থেকে ২০০ জনের মতো অথচ দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি। প্রতি ৫-৬ লক্ষ মানুষের জন্য একজন করে ডাক্তার রয়েছেন। মনোরোগবিদ্যা বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে ও স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে না পারায় চিকিৎসকরাও এই পেশায় আসতে উৎসাহ পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেবল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই নয়; প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য নার্স, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পদগুলোও খালি পড়ে রয়েছে।
পুরো দেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে মাত্র দুটি- পাবনা মানসিক হাসপাতাল এবং ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। এদিকে জেলা ও তৃণমূলের চিত্র আরও করুণ। দেশের ৬৪টি জেলার সিংহভাগেই কোনো স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। এমনকি প্রতিষ্ঠিত অনেক সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও চালু করা যায়নি মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ। গড়ে ৪-৫টি জেলা মিলিয়ে মাত্র একজন বিশেষজ্ঞ বসছেন।
দীর্ঘ লাইন সবজায়গায়
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’ গত ৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় ভোর না হতেই বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ লাইন। ৪০০ শয্যার এই হাসপাতালে একটি বেডও খালি নেই। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন।
জামালপুর থেকে ভোরে রওনা দিয়েছিলেন রাশেদুল হাসান (২৯)। গন্তব্য আগারগাঁওয়ের মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ডাক্তার দেখানো। পারিবারিক সমস্যায় বেশ কয়েক মাস ধরে তীব্র ডিপ্রেশন ও প্যানিক অ্যাটাকে ভুগছেন। নিজ জেলা ও আশপাশের ৩টি জেলায় কোনো স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকায় সঠিক চিকিৎসা পেতে তাকে বারবার ছুটি নিয়ে ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। রাশেদুল বলেন, "মানসিক সমস্যা হলে গ্রামে বা মফস্বলে চিকিৎসা পাওয়া তো দূরের কথা বিষয়টি কাউকে বোঝানোই দায়। ঢাকায় এসে ডাক্তার দেখানো অনেক কষ্ট।
অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ জন রোগী দেখেন চিকিৎসকরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানেও চিকিৎসকের দুটি পদ খালি আছে। ফলে, রোগী দেখতে ডাক্তারদেরও হিমশিম খেতে হয়। এদিকে, স্যার সলিমুল্লাহ (মিটফোর্ড) ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ২০০ জন মানসিক রোগী সেবা নিতে আসেন বলে জানা গেছে।
এমন বাস্তবতায় আজ ১০ অক্টোবর (শনিবার) পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস -২০২৬। এবছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে-"জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি"। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রতিপাদ্য আর কাগজের নীতিমালায় কাজ হবে না। স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য খাতকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পোস্ট সৃষ্টি ও পদায়ন না করলে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী অকালেই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে।
চিকিৎসা ঘাটতি ও আত্মহত্যার ঝুঁকি
বিভিন্ন গবেষণায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসাঘাটতির কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের বিপুলসংখ্যক মানুষই সেই সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যা সবই এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত। এদিকে আত্মহত্যা দেশে বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে আত্মহত্যা করেছেন ৭৬ হাজার ৩৬১ জন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছেন। এ সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের অনুমিত হিসাবের তিন গুণের বেশি।
আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি তরুণদের মধ্যে। পারিবারিক ও সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, বেকারত্ব, পড়াশোনা, পরীক্ষার চাপসহ বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত বিষয় এ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা ও কীটনাশকের মতো প্রাণঘাতী উপকরণের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বড় একটি অংশই ভুগছেন ডিপ্রেশনে। পরিসংখ্যান বলছে, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা প্রতি ১৮ জন মানসিক রোগীর মধ্যে ৭ জনই হতাশাজনিত রোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ডিপ্রেশন বিশ্বজুড়ে ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব দ্য ডিজিজেস’-এর এক নম্বর ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
ডিপ্রেশন এখন 'কমন'
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সাদিয়া আফরিন টাইমস টুডেকে বলেন, আমরা প্রায়ই সাময়িক মন খারাপ বা কোনো কাজে আগ্রহ না পাওয়াকে ডিপ্রেশন মনে করি যা সঠিক নয়। টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তীব্র মন খারাপ, দৈনন্দিন কাজে চরম অনিহা, হতাশা এবং ঘুম বা ক্ষুধায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে তবেই তাকে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বলা যায়।
তিনি বলেন, লক্ষণগুলো টানা দু’সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে অবহেলা না করে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, অবহেলিত ডিপ্রেশন পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবনে স্থবিরতা আনার পাশাপাশি আত্মহত্যার মতো করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখনও আমাদের সমাজে মানসিক রোগকে জিনের আছর ভাবা বা চিকিৎসকের কাছে যেতে লজ্জা পাওয়ার মতো কুসংস্কার রয়েছে; তবে প্রযুক্তির ব্যবহারে সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমেই এ সংকট থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক খাত উপেক্ষিত
স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের মাত্র ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ রাখা হয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যার বড় একটি অংশ আবার ব্যয় হয় বিশেষায়িত হাসপাতাল দুটির পরিচালন খরচে। ফলে গবেষণা, সচেতনতা বৃদ্ধি কিংবা জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের জন্য কোনো তহবিল অবশিষ্ট থাকে না। বি
২০১৮ সালে শতবর্ষের পুরোনো 'লুনেসি অ্যাক্ট' বাতিল করে প্রণয়ন করা হয়েছে আধুনিক 'মানসিক স্বাস্থ্য আইন'। ২০২২ সালে অনুমোদিত হয়েছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক চিকিৎসা যুক্ত করার কাজ চললেও পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব ও প্রশাসনিক অবহেলায় এর সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামীতে মানসিক স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে নাহলে এই মানসিক রোগ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়বে। তাদের মতে, দেশে দিন দিন মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতা তৈরি, নিয়মিত পরিচর্যা এবং প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞর মত
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের মানসিক রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা.মোঃ রাজিবুর রহমান টাইমস টুডেকে বলেন, ডিপ্রেশন বা মানসিক রোগের পেছনে একাধিক প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বংশগত কারণ, অর্থাৎ পরিবারে মানসিক রোগের ইতিহাস থাকলে পরবর্তীতে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া আধুনিক জীবনের অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, স্ট্রেসফূল জীবনযাপন এবং প্রতিনিয়ত রাত জাগার অভ্যাস মানুষের শরীরের বায়োলজি ও হরমোনের সামঞ্জস্য নষ্ট করে দিচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং হাইপোথাইরয়েডিজম, ডায়াবেটিস বা রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা থেকেও মানুষ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, ডিপ্রেশন প্রতিরোধে শরীর ও মন—দুইয়ের সঠিক পরিচর্যাই সুস্থ জীবনের মূল ভিত্তি। প্রতিদিন নিয়ম মেনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং রাত না জাগা অত্যন্ত জরুরি। সকালে বা বিকেলে নিয়মিত হাঁটা কিংবা শারীরিক ব্যায়াম করলে মন-মানসিকতা ভালো থাকে। এর পাশাপাশি ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, দুধ, ডিম ও বাদামের মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ডিপ্রেশন প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখে, যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা বাড়ানো প্রয়োজন। শিশুদের ঘরের বন্দিদশা থেকে বের করে মাঠে আউটডোর খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া উচিত। সর্বোপরি, শারীরিক ব্যথায় যেমন ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়, তেমনি মনের সমস্যাতেও দ্বিধাহীনভাবে সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
সংকট মোকাবেলায় সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে এই মানসিক বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে এটা খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। তবে, বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সাইকিয়াট্রি (বিএপি)-এর অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি তাদের সঙ্গে বসে একটি সমন্বিত প্ল্যানিং করেন, তবে দেশে মানসিক রোগীর বিশাল চাপ সামলানো অনেক সহজ হবে।
ডা. রাজিবুর রহমান আরও বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো সরকারি হাসপাতালগুলোতে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের শূন্য পদ বৃদ্ধি করা হলে নতুন চিকিৎসকরা পদায়ন পাবেন। এতে যেমন বিপুল সংখ্যক রোগীকে সঠিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে, তেমনি সরকারের পরিকল্পনাগুলোও মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।

