বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার সন্দেহে এক উপপরিচালককে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। শুধু ওএসডি করেই কর্তৃপক্ষ ক্ষান্ত হয়নি বরং কর্মকর্তার কক্ষ সিলগালা, আনসারের পাহারার ব্যবস্থা করা এমনকি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সূত্রে জানা গেছে, আগে থেকেই বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত উপপরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে ওএসডি করা হয়েছে। বিটিআরসিতে সনজিবের ব্যবহৃত ৩৪৭নং কক্ষ সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে, এমনকি কক্ষের বাইরে একজন আনসারকে পাহারা দিতেও দেখা গেছে। আগে থেকে সেই কক্ষের সামনে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকলেও নতুন করে তা স্থাপন করা হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে ঘটনা অস্বীকার করে বিটিআরসির মিডিয়া কমিউনিকেশন এন্ড পাবলিকেশন উইংয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরী টাইমস টুডেকে বলেন, এরকম কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই।
ঘটনাক্রম থেকে জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কোনো এক সময়ে বিটিআরসির বর্তমান চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী সকল কমিশনারসহ কমিশন সভা থেকে বের হয়ে ৩৭৪নং রুমের সামনে আসেন। এসময় ৩৪৭নং কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পান সনজিব ও তার তিনজন উপপরিচালক ব্যাচম্যাট কাজী মো. আহসানুল হাবিব, জাকির হোসেন খাঁন ও এস এম আফজাল রেজা একই কক্ষে অবস্থান করছেন। তাৎক্ষণিক এই পরিদর্শনের সময় চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখান। এসময় তিনি এই কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করেন। আদালতে রিটের মাধ্যমে তাকে অপমান করা হয়েছে, এমনকি সনজিবের এই রুম থেকেই সকল ষড়যন্ত্র হয় বলেও উল্লেখ করেন চেয়ারম্যান। এর ঠিক ঘণ্টা খানেক পর সনজিবকে ওএসডি করা হয়। সেদিন সনজিবের কক্ষ সিলগালা করার গুজব রটলেও তা করা হয়নি। ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সনজিবের ৩৪৭নং কক্ষটি সিলগালা করা হয়।
বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সিলগালা কক্ষের সামনে একজন আনসার পাহারারত রয়েছে। অন্য এক ভিডিওতে দেখা যায়, যে কক্ষটি সিলগালা করা হয় সেই কক্ষের স্লাইডিং দরজার নবের জায়গাটিতে স্কচটেপ দিয়ে একটি নোটিশ সেঁটে দেওয়া হয়েছে। সেই নোটিশটি এমন স্কচটেপ দেওয়া রয়েছে যে, পুরো এক রোল স্কচটেপ শুধু এজন্যই ব্যবহার করা হয়েছে।
নোটিশে লেখা রয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত (৩৪৭নং) রুমে প্রবেশ নিষেধ’। অতচ এই কক্ষে সনজিব আগের দিন পর্যন্ত অফিস করেছেন। তিনি প্রশাসন বিভাগে আগে থেকে সংযুক্ত থাকলেও তাকে সেখানে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি এই কক্ষ সিলগালা করার আগেও সনজিবকে জানানো হয়নি। তবে এই ঘটনার জন্য অন্য দুজন আহসানুল হাবিব, আফজালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলেও জাকিরকে বদলি করা হয়েছে স্পেকট্রাম বিভাগে।
কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাসে আদালতের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে চেয়ারম্যানের রোষানলের শিকার হয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মার্চ মাসে অডিট আপত্তি রয়েছে এমন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন বিটিআরসির উপপরিচালক সনজিব, কাজী মো. আহসানুল হাবিব, জাকির হোসেন খাঁন, এস এম আফজাল রেজা, মো. আসিফ ওয়াহিদ ও মো. হাসিবুল কবির। এর পরপরই বিভাগে বদলি করা হয় জাকির, আহসানুল হাবিব। সনজিব ও আফজালকে যথাক্রমে রংপুর ও সিলেটে স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশনে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু উপপরিচালকের পদ রংপুর ও সিলেটে না থাকায় এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানালে তা প্রত্যাখ্যাত হন। এর বিরুদ্ধে রিট করলে আদালত এ সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে দায়িত্বহীন অবস্থায় সনজিব বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে, উপপরিচালক সনজিব কুমার সিংহ টাইমস টুডেকে বলেন, আমরা বিটিআরসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট করেছিলাম যা চেয়ারম্যান ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেনি। রিটকারি সবাইকে বদলি করেছে। আফজাল ও আমাকে সিলেট ও রংপুরে সংযুক্ত করা হয়। যার বিরুদ্ধে আপিল করলেও গৃহীত হয়নি। বরং দায়িত্ব ছাড়াই সময় পার করেছি।
ওএসডির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপপরিচালক সনজিব বলেন, আমি অফিস কক্ষে ছিলাম তখন চেয়ারম্যান এসে দেখতে পান সেখানে অন্য তিন ব্যাচম্যাটও উপস্থিত রয়েছেন। এটাকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে যা আবান্তর ও অমূলক। ব্যাচম্যাটদের সঙ্গে অফিস কক্ষে একসাথে অবস্থান কাকতালীয়। এজন্য ওএসডি এবং রুম সিলগালা করা বিটিআরসিতে নজির নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিটিআরসিতে চেয়ারম্যানের বিরাগভাজন হবার কারণে কারও অফিস কক্ষ সিলগালা করার ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। তবে অপরাধ সংগঠনের স্থানকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কখনো কখনো সিলগালা করে যেন আলামত নষ্ট না। সনজিব একজন পদস্থ কর্মকর্তা তিনি চোর ডাকাত নন কিংবা এমন কোনো অপরাধ করেনি যেজন্য অপরাধ সংগঠনের স্থানকে সিলগালা করার প্রয়োজন হয়েছে। উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মর্কতার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা নজিরবিহীন।
এবিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া টাইমস টুডেকে বলেন, কর্মকর্তাকে যেহেতু ওএসডি করা হয়েছে সে যেন ওই ডেস্ক ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য কর্তৃপক্ষ এ কাজ করেছে বলে ধারণা করছি। কিন্তু সেজন্য কর্মকর্তাকে না জানিয়ে সিলগালা করা ঠিক হয় নাই, শোভনীয় নয়। অপরাধ সংগঠনস্থল এভাবে সিলগালা করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। এখানে এরকম কোনো অপরাধ ঘটেছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
এবিষয়ে জানতে বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক ও পরিচালককে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টার পরও তাদেরকে পাওয়া যায় নাই।

