আগামী বছরের প্রথম দিন থেকেই ফের চালু হচ্ছে ন্যাশনাল ইকুয়েপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেম। দীর্ঘদিন আলোচনার সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা এই সেবাটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায় বিটিআরসি।
প্রাথমিকভাবে ডি-রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন বাতিলকরন) ছাড়াই সিস্টেম চালু করা হলেও সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে পরবর্তীতে মূল পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী সকল ফিচারসহ সিস্টেমটি চালু করবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
মোবাইল হ্যান্ডসেটের অবৈধ আমদানি ও ব্যবহার, নকল হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রতিহত, হ্যান্ডসেট চুরি ও অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধ ও সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করতে বিটিআরসি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অকার্যকর থাকা এই সিস্টেমটি পুনরায় চালুর জন্য কমিশনের সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মতামত পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আর্থিক ক্ষতির খতিয়ান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সম্মতিপত্র, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা ভূমিকা রেখেছে।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারীর আগ্রহে এই সেবা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। চলতি বছরের প্রথম দিন থেকেই এই সেবা চালু হবার কথা থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মাথায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এক বছর পর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দুই ধাপে সেবাটি চালু করতে যাচ্ছে বিটিআরসি।
প্রথম ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন বাতিলকরন) পদ্ধতি ব্যতীত মূল পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী অন্যান্য ফিচারসহ সিস্টেমটি চালু করা হবে। অর্থাৎ, অবৈধভাবে উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত হ্যন্ডসেটসমূহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে, তবে সেগুলো বন্ধ করা হবে না।
দ্বিতীয় ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন বাতিলকরন) পদ্ধতি চালু করা হলে অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধ করে প্রকৃত/সর্বশেষ মালিক কর্তৃক হ্যন্ডসেটের ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। প্রথম ধাপে অবৈধভাবে ও রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে আনা মোবাইল ফোনের ক্রয়, বিক্রয় এবং ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে।
তবে বিভিন্ন অপরাধে ক্লোন হ্যান্ডসমূহের ব্যবহার রোধ করতে দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করা হয় কমিশন সভার কার্যপত্রে।
জানতে চাইলে বিটিআরসির মিডিয়া কমিউনিকেশন এন্ড পাবলিকেশন উইংয়ের উপপরিচালক মোঃ আব্দুস শাহীদ চৌধুরী টাইমস টুডেকে বলেন, বিটিআরসির পক্ষ থেকে এনইআইআরের প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল।
কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালে এনইআইআর এর সেবা চালু হয়। তবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে তৎকালীন সরকার মূল পরিকল্পনা ও ডিজাইন হতে অবৈধভাবে আমদানিকৃত মোবাইল ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ এবং ক্লোন হ্যান্ডসেটের ব্যবহার রোধ করার ফিচার বাদ দিয়ে সিস্টেমটি চালু রাখা হয়। ফলে এনইআইআর স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য সরাসরি ব্যাহত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এ প্রেক্ষিতে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হতে মূল পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী সিস্টেমটি পুনরায় চালুর জন্য কমিশনকে পরামর্শ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ২০২৪ সালে অক্টোবরে এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, অবৈধভাবে উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটসমূহ শুল্ক ফাকি দিয়ে দেশের বাজারে ক্রয় ও বিক্রয় এর মাধ্যমে সরকারের প্রতিবছর ২০০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
ফলে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারীর নির্দেশনায় ২০২৫সালের ১ ডিসেম্বর সেবাটি সম্পূর্ণরূপে চালু করার সিদ্ধান্ত দেয়। এর আগে একই বছরের ২৮ জুন মাস অনুরূপ সিদ্ধান্ত নেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।
যদিও, বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সিস্টেমটি চালুর জন্য অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে পুনরায় সম্পূর্ণরূপে চালুর জন্য জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) চলতি বছরে ৯জুন কমিশনকে এক চিঠিতে জানায়।
এরপরই সরকার ও কমিশন উঠেপরে লাগে এনইআইআর সিস্টেম চালু করতে। ফলে চলতি বছরের ২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সভায় সিস্টেমটি চালু করতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সভায় আগামী বছরের প্রথম দিন থেকে এনইআইআর সিস্টেমটি চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
ঘুরে ফিরে সিনেসিস আইটিই থাকছে
অন্যদিকে, পদ্ধতিগত ত্রুটির দোহাই দিয়ে নতুন কোনো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করতে না পারায় এনইআইআর সেবা রক্ষণাবেক্ষণের ভার থাকছে বিতর্কিত সিনেসিস আইটির কাছেই। আগামী এক বছর সিস্টেমটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন সেবার জন্য প্রাথমিক আর্থিক প্রস্তাবও পাওয়া গেছে বলেও কমিশনের মাসিক কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে উল্লেখ করা হয়, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিটিআরসি ও সিনেসিসের মধ্যকার চুক্তির মেয়াদ ৩১ অক্টোবর ২০২৪ সালে শেষ হলেও পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া বাতিল হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ না হওয়ায় সিনেসিস আইটি হতে সেবা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সেবা প্রদান বাবদ সিনেসিস আইটি ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬ হাজার ৮৪৩ টাকার একটি প্রস্তাবও দিয়েছে।
সিনেসিসের নিকট থেকে সেবা গ্রহণের পক্ষে বেশ কিছু যুক্তি কমিশন সভার কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় এর আপগ্রেডেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি সিস্টেমটি আপগ্রেডেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ৫ হতে ৬ মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হবে। এর পর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সিস্টেমটি বুঝে নিতে আরো ১ হতে ২ মাস সময় প্রয়োজন হবে। এর পূর্বে সিস্টেমটি চালুকরনের লক্ষ্যে অবশ্যই একটি প্রতিষ্ঠানকে দ্বায়িত্ব প্রদান করতে হবে।
যুক্তিতে আরও বলা হয়, সিনেসিস গত ২০২১ সাল হতে অদ্যাবধি সিস্টেমটি বিটিআরসি'র নির্দিষ্ট চাহিদা ও প্রযোজন অনুযাযী কাস্টমাইজ করেছে, যার কারিগরি প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল এবং বর্তমানেও প্রতিষ্ঠানটি সিস্টেমটি পরিচালনা করছে।
সিস্টেমটি কাস্টমাইজেশনের অভিজ্ঞতা সিনেসিসের রযেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেমের আর্কিটেকচার, কার্যপ্রণালী ও অপারেশনাল জটিলতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও গভীর জ্ঞান রযেছে। সার্বিক বিবেচনায় সিনেসিসকে অতিরিক্ত এক বছর মেযাদের জন্য সেবা প্রদানের নিমিত্ত বিবেচনা করা যেতে পারে।

