...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

এইচপিএলও নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান

নিজেরই চাকরি নেই, ৭৯ হাজার ৮৪৮ পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি সাগরের

গোয়েন্দা সংস্থার নাম ভাঙিয়ে ভয়ংকর জালিয়াতি

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৫ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৮
Shares
নিজেরই চাকরি নেই, ৭৯ হাজার ৮৪৮ পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি সাগরের

ছবি: এআই

চাকরি নেই, তবু ৭৯ হাজার ৮৪৮ পদে নিয়োগের বিশাল বিজ্ঞপ্তি। নিজস্ব কার্যালয় নেই, তবু ১৫ তলা ভবনের বুক ফোলানো দাবি। সরকারি কোনো অনুমোদন নেই, অথচ গঠন করা হয়েছে ২৭টি উপ-কমিটি। এই আছে আর এই নেই- এর এমন অভিনব ভেলকিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, এনএসআই, ডিজিএফআই, সিআইডি ও পিবিআই-এর মতো রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে লাখো বেকার তরুণের পকেট কাটছে কথিত স্বাস্থ্য, শান্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা এইচপিএলইও। টাইমস টুডের হাতে আসা নথি বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর ডিজিটাল জালিয়াতির আদ্যোপান্ত।

৮০ হাজার পদের টোপে শতকোটির ছক

সূত্র বলছে, জালিয়াতি এই চক্রের মূল হোতা মো. মেহেদী হাসান ওরফে সাগর। বেকারত্বকে পুঁজি করে ২৭টি ভিন্ন পদে প্রায় ৮০ হাজার লোক নিয়োগের ভুয়া বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। শর্ত জুড়ে দেন- চাকরি পেতে প্রার্থীকে দিতে হবে ১ হাজার ২০০ টাকা। ৫৫৫ টাকা জয়েনিং ফি, ৫০০ টাকা অ্যাকাউন্টে জমা, বাকি টাকা কার্ড ও চেক বইয়ের জন্য। সহজ অঙ্কের হিসাবে, ৮০ হাজার মানুষ ফাঁদে পা দিলে চক্রটির হাতে অনায়াসেই ঢুকবে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা। প্রতারণাকে শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য করতে চাকরিপ্রার্থীদের ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড যশোর ক্যান্টনমেন্ট শাখায় অ্যাকাউন্ট খোলার টোপ দেওয়া হয়।

কাগজে ২৭ কমিটি, হাওয়ায় ১৫ তলা ভবন

মেহেদী চক্র প্রতারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে বৈধ প্রমাণে আশ্রয় নিয়েছে অভিনব মিথ্যার। আন্তর্জাতিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সরকারসহ ২৭টি ভুয়া উপ-কমিটি গঠনের তথ্য প্রচার করেছে। বিশ্বাস অর্জনে ১৫ তলা ভবন নিজস্ব (বেসমেন্টসহ ১৮ তলা) নির্মাণের কাল্পনিক দাবি করছে। যে ভবনের নিচতলায় থাকবে সুপারশপ (যেখানে কার্ডধারীরা ২০ শতাংশ ছাড় পাবেন), দোতলায় মসজিদ, ৩য় থেকে ৫ম তলায় হাসপাতাল। শুধু তাই নয়, প্রতিটি থানায় ৫৫৫টি ইজিবাইক ও অটোরিকশা বিতরণের প্রতিশ্রুতি। সবমিলিয়ে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৫০টি যান। বাস্তবে একটি চাকারও অস্তিত্ব নেই। নিজেদের কার্যালয় হিসেবে যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের (আইটি পার্ক) ঠিকানা ব্যবহার করলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বই নেই।

পার্কের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলছেন, মাঝে মাঝে কিছু যুবক এসে ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে চলে যায়, কিন্তু ভেতরে তাদের কোনো কার্যালয় নেই।

রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর বাহিনীর নাম ব্যবহারের স্পর্ধা

শিউরে ওঠার মতো তথ্য মিলেছে সংস্থাটির সদস্যবৃন্দের ছকে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর নাম সরাসরি ব্যবহার করে আলাদা কমিটির ছক ছাপিয়েছে তারা। সেনাবাহিনী, পুলিশ, ডিবি, ডিএসবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, সিআইডি, পিবিআই, বিজিবি, র‍্যাব, আনসার এবং জেলখানা- এই ১২টি প্রতিষ্ঠানের নামে আলাদা ছক ছাপা হয়েছে। বেসরকারি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের এহেন কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।

ফ্ল্যাটের টোপ ও পরিচয় চুরির ভয়াবহ ফাঁদ

চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে আকর্ষণীয় ফন্টে লেখা- সব অফিসারকে যোগদানের পরই সংস্থার নিজস্ব ভবনে ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা। অথচ গোপন নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১ বছরের চুক্তিভিত্তিক সম্পূর্ণ অস্থায়ী চাকরির কথা। প্রলোভনের এখানেই শেষ নয়। ছয় মাসের প্রশিক্ষণে মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা, বছরে দুটি উৎসব ভাতা, পঙ্গু হলে বিদেশে নিয়ে কৃত্রিম অঙ্গ লাগানো এবং হজ-ওমরাহে পাঠানোর অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুতি।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চক্রটি চাকরিপ্রার্থীদের মূল শিক্ষাগত সনদ, এনআইডি এবং বর্তমান প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডের কপি জিমেইল ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডোমেইন ছাড়া লাখ লাখ প্রার্থীর এই সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ মূলত পরিচয় চুরির ভয়াবহ ফাঁদ। এসব তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ব্যবহার হতে পারে।

প্রতারণার শিকার যশোর ঝিকরগাছার যুবক শফিকুল আক্ষেপ করে বলেন, সেনাবাহিনী আর ট্রাস্ট ব্যাংকের নাম দেখে বিশ্বাস করেছিলাম। মায়ের এনজিওর কিস্তির জমানো টাকা থেকে ১২০০ টাকা দিয়েছি। মেইল বা ফেসবুকে যোগাযোগ করলে উত্তর মেলে না। 

ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম জানান, ফেসবুকে বুস্ট করা চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে গ্রামের ৫ বন্ধু মিলে ৬ হাজার টাকা পাঠিয়ে এখন তারা ব্লকড।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বেকার তরুণদের কাছ থেকে শতকোটি টাকা আদায় করা হলে বড় অংশ সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে চরমপন্থার অর্থায়নে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। বিপুল পরিমাণ টাকার মানি ট্রেইল কোথায় তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে।

এত বড় পুকুরচুরির পরও দম্ভের কমতি নেই চক্রের হোতা সাগরের। বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নম্বরে ফোন করে ৮০ হাজার যুবকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতেই ফুঁসে ওঠেন তিনি। শাসিয়ে বলেন, ‘আমি কে, আপনি কি জানেন। আমি মেহেদী। জেনে-বুঝে কথা বলবেন। ২০২১ সাল থেকে এই কার্যক্রম করে আসছি।’

আইটি পার্কের ভুয়া ঠিকানার কথা তুলতেই সুর নরম হয় তার। আমতা আমতা করে বলেন, ‘সেখানে আমার পজেশন আছে। আপনি আসেন, লোকেশন পাঠিয়ে দেব।’ তড়িঘড়ি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে নম্বর ব্লক করে দেন সাগর।

ট্রাস্ট ব্যাংক যশোর ক্যান্টনমেন্ট শাখার ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলামের সাথে টাইমস টুডে যোগাযোগ করেছে। তবে, গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে ফোন কেটে দেন এবং পরে আর ফোন ধরেননি তিনি।

এইচপিএলও নামের এমন কোনো সংস্থা নিবন্ধিত নয় বলে নিশ্চিত করেছেন যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা।

যশোর পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম টাইমস টুডেকে বলেন, বিষয়টি দ্রুততার সাথে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটে এমন কিছু হলে দ্রুত আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে পুলিশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে জানান তিনি।

এদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভুয়া প্রকল্প প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে, রাষ্ট্রের নাকের ডগায় বসে স্পর্শকাতর বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে অভিনব জালিয়াতির লাগাম এখনই টানা না হলে পথে বসবে হাজারো পরিবার। বেকার তরুণদের কোটি টাকা সত্যিই উগ্রবাদে গেলে বিষয়টি শুধু প্রতারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, হয়ে দাঁড়াবে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ অশনিসংকেত-বলছেন অনেকেই।