আমানতকারীদের জমানো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যেখানে ব্যাংকের মূল দায়িত্ব, সেখানে গ্রাহকের অর্থকেই পরিবারের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার বানিয়েছিল দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি। জনকল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) নামে গঠিত ‘প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশন’কে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাবেক চেয়ারম্যান ড. এইচ. বি. এম. ইকবাল ও তার পরিবার তছরুপ করেছেন প্রায় ৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। এখানেই শেষ নয়, কাগুজে হিসাব মিলিয়ে ব্যাংককে ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে ইনসেনটিভ বোনাসের নামে তারা নিজেদের পকেটে পুরেছেন আরও ৩৭ কোটি ৫ লাখ টাকা।
ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্সের তৈরি করা এক ফরেনসিক অডিট রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে টাইমস টুডের অনুসন্ধানে ব্যাংকিং খাতের এই নজিরবিহীন দুর্নীতির আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।
দফায় দফায় টাকা লুট
টাইমস টুডের অনুসন্ধানে দেখা যায়, জনকল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে গঠিত ‘প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশন’কে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফাউন্ডেশনের সংঘস্মারক (MOA) অনুযায়ী বার্ষিক পরিচালন মুনাফার সর্বোচ্চ ১ শতাংশ বা ১ কোটি টাকা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ২০২৩ সালেই আইন ভেঙে দুই দফায় ৩০ কোটি টাকা তোলা হয়। এর মধ্যে ২০ কোটি ১২ লাখ টাকার অনুদানেরই কোনো আইনি ভিত্তি বা অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোনো প্রকার পূর্বানুমতি ছাড়াই সরাসরি ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় আরও ৫ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের মনগড়া অনুমোদন বসিয়ে ক্ষমতার জোরে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ছাড় করায়।
নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফাউন্ডেশনের নামে ছাড় করা এই অর্থের সিংহভাগই গেছে ড. ইকবালের পারিবারিক তিন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে। এর মধ্যে তার বাবার নামে গড়ে ওঠা জেড রহমান প্রিমিয়ার ব্যাংক স্কুল অ্যান্ড কলেজ একাই নিয়েছে ২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা নিয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ড. মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির নামে সরানো হয়েছে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, এই তিন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের কব্জায় গেছে মোট ৩৪ কোটি ১ লাখ টাকারও বেশি, যার ট্রাস্টি বোর্ড ও পরিচালনা পর্ষদের প্রধান ড. এইচ.বি.এম. ইকবাল নিজে এবং তার পরিবারের সদস্যরা। এমনকি ২০২০ সালে একদিনেই ২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা স্থানান্তর করে কৌশলে আগের বকেয়া অগ্রিমের সাথে সমন্বয় দেখিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও চালানো হয়।
বোনাসের নামেও লুট
আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা এখানেই থামেনি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (IAS 24) অনুযায়ী ব্যাংকের যেকোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের তথ্য আর্থিক বিবরণীতে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হলেও শেয়ারহোল্ডার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর এড়াতে অডিট নোটে তা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়।
তথ্য বলছে, পাশাপাশি ব্যাংকের প্রকৃত আয় আড়াল করে কৃত্রিমভাবে আর্থিক সূচক ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর এক চতুর কৌশল হাতে নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের প্রকৃত আয় বাড়িয়ে এবং পরিচালনা ব্যয় স্থগিত রেখে ভুয়া মুনাফার হিসাব তৈরি করা হয়। এই জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তথাকথিত বার্ষিক কর্মক্ষমতা বোনাসের নামে আট বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয় ৩৭ কোটি ৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে ৩ কোটি টাকা বোনাস দেওয়া হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায়। এমনকি ব্যাংক যখন তীব্র তারল্য ও পারফরম্যান্স সংকটে ভুগেছে, তখনও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রায় ১২ কোটি টাকা বোনাস হিসেবে তুলে নেওয়া হয়েছে যার পুরোটাই ছিল আমানতকারীদের অর্থের ওপর সরাসরি তছরুপ।
এই বিষয়ে জানতে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর মফিজের সঙ্গে টাইমস টুডের এই প্রতিবেদক একাধিকবার ফোন দিলেও তার সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমস টুডেকে বলেন, সম্পাদিত ফরেনসিক অডিটের প্রতিবেদনে যেসকল গুরুতর অনিয়ম বা বিচ্যুতি উঠে এসেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি ও দাফতরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে উপযুক্ত নির্দেশনা প্রদান করছে।
তিনি আরও বলেন, এই কার্যক্রমটি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং প্রতিবেদনে যেসকল অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বা যাবে তার প্রতিটির ক্ষেত্রেই পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক নির্দেশিকা জারি করা হবে। কোথায় কী করণীয় এবং কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। এই অডিট রিপোর্টের ফলাফল ও সুপারিশসমূহকে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।

